দামেস্কে ক্যাফেতে বিস্ফোরণ: ঝরল ৯ জনের প্রাণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
দামেস্কে ক্যাফেতে বিস্ফোরণ: ঝরল ৯ জনের প্রাণ

প্রকাশ: ০৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের বুকে আবারও নেমে এল শোকের ছায়া। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দিনের ব্যস্ততম সময়ে দামেস্কের প্রধান আদালত চত্বরের সন্নিকটে অবস্থিত একটি জনপ্রিয় ক্যাফেতে এক ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আকস্মিক এই বিস্ফোরণের তীব্রতায় মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে ওঠে চারপাশ, আর রাজপথ পরিণত হয় আর্তনাদ ও আহাজারিতে। সরকারি সূত্র এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, এই নৃশংস ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জন নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন। হতাহতদের মধ্যে স্থানীয় আইনজীবী এবং ক্যাফেতে আসা সাধারণ মানুষ রয়েছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো রাজধানীজুড়ে এখন নিরাপত্তা ও উদ্বেগ চরমে।

বিস্ফোরণের পরপরই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকাটি কর্ডন করে ফেলে। দামেস্কের গভর্নর মাহের ইদলিবী জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করবে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিস্ফোরক যন্ত্রটিকে শক্তিশালী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা জনবহুল একটি স্থানে স্থাপন করা ছিল। হামলাকারীদের শনাক্ত করতে এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিস্ফোরণস্থল ধোঁয়া ও ধুলোয় আচ্ছন্ন, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছেন অনেকে, আর উদ্ধার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন পথচারীরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জালাল আলজানানি, যিনি ঘটনার সময় কাছেই ছিলেন, তিনি বর্ণনা করেন সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, বিকট শব্দে মনে হয়েছিল যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। কোনো কিছু বোঝার আগেই ক্যাফেটির দিকে ছুটে গিয়ে দেখি মেঝেতে রক্ত আর মানুষের নিথর দেহ। স্থানীয় মানুষের সহায়তায় আমরা অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই ব্যক্তিগত গাড়িযোগে আহতদের হাসপাতালে পাঠাতে শুরু করি। যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের আর্তনাদ আর রক্তমাখা শরীর দেখে যে কেউ শিউরে উঠবেন। সিরিয়ার রাজধানীতে এই ধরনের বিস্ফোরণ দীর্ঘদিনের শান্তির প্রত্যাশায় থাকা মানুষের মনে পুরনো ক্ষতকে আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

সিরিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সেই যুগান্তকারী পরিবর্তনের পর আসাদ রাজবংশের বিদায় এবং নতুন শাসন ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আহমদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশকে স্থিতিশীল করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে চরমপন্থী গোষ্ঠী ‘দায়েশ’ বা আইএস-এর জঙ্গিদের দমনে সরকারি বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। রাষ্ট্রপতি আল-শারা ইতিপূর্বে আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন ‘হায়াত তাহরির আল শাম’-এর নেতৃত্বে ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তিনি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশে ঐক্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন। কুর্দি-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর দখল থেকে দেশের বিশাল অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও, পুরোপুরি স্থিতিশীলতা এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়ে এখনই কোনো গোষ্ঠী দায় স্বীকার করেনি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ার বর্তমান স্থিতিশীলতাকে বানচাল করতে এবং নতুন সরকারের জনসমর্থনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো হতে পারে। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে গির্জায় আত্মঘাতী হামলার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে দগদগে। সেই ঘটনার পর এই বিস্ফোরণ ফের প্রমাণ করল যে, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হলেও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা কতটা জটিল কাজ। সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন সময় আইএস আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বড় ধরনের হামলা নস্যাৎ করার দাবি করলেও, জনাকীর্ণ স্থানে এমন ছোটখাটো কিন্তু বিধ্বংসী বিস্ফোরণ ঠেকানো তাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের মানুষের মধ্যে এই ঘটনা এক গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। বছরের পর বছর যুদ্ধ, সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আসা সিরিয়ার সাধারণ মানুষ এখন কেবল স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ পেতে চায়। কিন্তু এই ধরনের হামলা তাদের সেই স্বপ্নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। আইনজীবীদের যাতায়াতের স্থানে এমন হামলা সচেতন নাগরিক সমাজের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সাধারণ সিরীয়রা এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে, তাদের প্রশ্ন—তবে কি সহিংসতা এখনো পিছু ছাড়ছে না? রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

দামেস্কের এই ক্যাফে বিস্ফোরণ কেবল নয়টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, এটি পুরো সিরিয়ার নিরাপত্তার দুর্বলতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি ঠিক কারা ঘটিয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, এই হামলাটি সিরিয়ার বর্তমান শাসন ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। সরকার যদি দ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির মুখোমুখি করতে না পারে, তবে জনমনে অবিশ্বাসের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সিরিয়ার এই ক্রান্তিলগ্নে শান্তির বার্তা আর সহিংসতার এই সংঘাত—কোনটি শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, এখন সেই উত্তর খোঁজার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত