খামেনির বিদায়: কান্নায় ভাসল তেহরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
খামেনির বিদায়: কান্নায় ভাসল তেহরান

প্রকাশ:  ০৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের ইতিহাসে এক চরম শোকাবহ ও উত্তাল সময় পার করছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো জাতিকে এক গভীর শূন্যতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সেই শোকের রেশ ধরেই শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়োজিত বিদায় অনুষ্ঠানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই শোকানুষ্ঠান পরিণত হয়েছিল কান্নার রোল ও আবেগের মহাসমুদ্রে। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ইরানের জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাদের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। প্রিয় নেতার বিদায়ে তাদের এই কান্না যেন পুরো ইরানের কোটি মানুষের বেদনারই প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছিল।

তেহরানের আকাশ-বাতাস যেন শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে। গ্র্যান্ড মোসাল্লার বিশাল প্রাঙ্গণ ছাপিয়ে সেই শোকের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো তেহরান নগরীতে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই বিদায় অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন মানুষের সমাগম হতে পারে, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জনসমাগমের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামাদিয়ান জানিয়েছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রবিবারের সকাল ৬টা থেকে মোসাল্লার ফটক সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও, জনস্রোতের কথা বিবেচনা করে প্রয়োজনে দরজা আরও আগে খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে নিরাপত্তা বাহিনী। কর্তৃপক্ষ জনগণকে ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সাথে নির্ধারিত সময়ে প্রার্থনা স্থলে পৌঁছানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।

ইরানের এই বিদায় অনুষ্ঠান কেবল অভ্যন্তরীণ কোনো কর্মসূচি নয়, বরং এটি বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা এসে পৌঁছেছেন তেহরানে। অনুষ্ঠানে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মোহসেনি এজেই এবং এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আয়াতুল্লাহ সাদেক আমোলি লারিজানি উপস্থিত থেকে শোকাহত জাতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যদের তালিকায় রয়েছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির, ইরাকের রাষ্ট্রপতি নিজার আমেদি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এবং তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইমোমালি রাহমন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশ থেকে সরকারি প্রতিনিধিদল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। তবে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে তেহরান। ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করেছেন যে, যেসব দেশ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনকে সমর্থন বা মদদ দিয়েছে, তাদের এই বিদায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এটি ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির কঠোর অবস্থানের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খামেনির পরবর্তী ইরানের জন্য এই শোকানুষ্ঠানটি কেবল একটি বিদায় পর্ব নয়, বরং এটি তাদের বৈশ্বিক মিত্রতা ও শক্তির বহিঃপ্রকাশের একটি ক্ষেত্রও বটে।

পুরো বিদায় অনুষ্ঠান ঘিরে তেহরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অভূতপূর্ব। আকাশপথে নজরদারি থেকে শুরু করে গ্রাউন্ড লেভেলে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। শোকের মাঝেও জনগণের আবেগ ও ক্ষোভ যেন কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না করে, সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে প্রশাসন। বিভিন্ন স্থান থেকে শোকযাত্রায় অংশ নিতে আসা মানুষের দীর্ঘ সারি যেন থামছেই না। তাদের হাতে খামেনির প্রতিকৃতি এবং নানা শোকবার্তা সম্বলিত ব্যানার ও পোস্টার দেখা গেছে। ইরানের মানুষ তাদের এই সর্বোচ্চ নেতাকে কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবেই নয়, বরং পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেই গণ্য করত। তাই আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠান তাদের কাছে কেবল একজন ব্যক্তির বিচ্ছেদ নয়, বরং এক দীর্ঘ সংগ্রামের মাইলফলক স্মরণের মতো।

অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রতিটি ইরানি নাগরিকের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সংসদ স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য দেশটির গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষের আবেগ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে দেখা যায় প্রিয় নেতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়তে, যা উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ে শোকের ঝড় তুলেছে। এই আবেগঘন মুহূর্তগুলো যেন পুরো জাতিকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও বৈদেশিক চাপের এই কঠিন সময়ে খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানটি তাদের সাহসের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে।

আগামী দিনগুলোতে ইরান কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। তবে তেহরানের এই জনসমুদ্র ও শোকের তীব্রতা বলে দিচ্ছে, খামেনির আদর্শ ও তার রাজনৈতিক দর্শন ইরানের জনগণের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। রবিবারের মূল বিদায় ও প্রার্থনা অনুষ্ঠানটি শেষ হওয়ার পর খামেনিকে কোথায় সমাহিত করা হবে এবং এরপর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার কীভাবে সুসংহত হবে, তা নিয়ে এখন থেকেই নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। তবে আপাতত তেহরান শোকের চাদরে ঢাকা। আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠানে সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না ও প্রার্থনা যেন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে, যেখানে শোক ও সাহসের সংমিশ্রণ ঘটেছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের দিকে, দেখার অপেক্ষায় আছে এই শোকাবহ ঘটনা দেশটির ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত