প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্প খাত এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দেওয়া এই খাতটি এবার বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাতটি তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং রপ্তানি আয়ে দেখা দিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত পতন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরের ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী এই স্তম্ভের এই পতন নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের এই খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ওভেন ও নিট—দুই খাতেরই পারফরম্যান্স আশানুরূপ ছিল না। বিশেষ করে নিট পোশাক রপ্তানি খাত থেকে আয়ের অংক ২১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়। ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই; ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে আয় সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলারে। সামগ্রিকভাবে ০ দশমিক ৬১ শতাংশ হ্রাসের মধ্য দিয়ে ওভেন খাত তার অবস্থান ধরে রাখার লড়াই চালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আয়ের এই সামগ্রিক নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অর্থনীতির ভাষায়, যে খাতের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি নির্ভরশীল, সেই খাতের এই নাজুক পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই একটি সতর্কবার্তা।
রপ্তানি আয়ের এই মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, পুরো বছরটি ছিল চরম অস্থিরতার। অর্থবছরের শুরুটা হয়েছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। জুলাই মাসে ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ায় সবাই ভেবেছিলেন, এ বছর হয়তো রেকর্ডের পথে হাঁটবে পোশাক শিল্প। এপ্রিলে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ এবং জুনে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ঝলকানি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু পুরো বছরের চিত্রটি ছিল অনেকটা রোলার কোস্টারের মতো। আগস্ট মাস থেকেই মূলত নেতিবাচক ধারায় প্রবেশ করে এই খাত। মার্চ মাসে রপ্তানি আয়ে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে, যখন রপ্তানি আয় প্রায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হ্রাস পায়। একই ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসেও যথাক্রমে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ ও ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ পতন রেকর্ড করা হয়েছে। বছরের কিছু মাসে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলেও অধিকাংশ মাসের দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রবণতা শেষ পর্যন্ত বার্ষিক হিসাবকে লোহিত অঙ্কে নিয়ে গেছে।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির পেছনে বহুমুখী কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, বিশ্ববাজারে পোশাকের দুর্বল চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রমাগত কম দাম প্রস্তাব করার প্রবণতা অনেক কারখানাকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। একদিকে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কমছে, অন্যদিকে তখন দেশের অভ্যন্তরে মজুরি বৃদ্ধি, কাঁচামাল যেমন—সুতা, রং, রাসায়নিকের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই দুইয়ের চাপে পড়ে বহু কারখানা বর্তমানে লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই কারখানাগুলোর বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পোশাক খাতের এই সংকট কেবল ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, বরং দেশের সাধারণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে। যেহেতু হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, তাই রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার অর্থ হলো তাদের চাকরির নিরাপত্তা হুমকিতে পড়া। পাশাপাশি, এই খাত থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের রিজার্ভ মজুত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রপ্তানি আয় কমলে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে, যা সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, তার ফলে ক্রেতা দেশগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে তারা সাশ্রয়ী পোশাকের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশি কারখানার পণ্যমূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এখন সময় এসেছে এই খাতটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য নতুন করে চিন্তাভাবনা করার। সরকারি নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের নতুন বাজার অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। বিশেষ করে উদ্ভাবনী পণ্য তৈরি এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। সেই সঙ্গে পোশাক শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবেই কেবল সংকট কাটিয়ে এই শিল্প পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং প্রবৃদ্ধির চাকা দ্রুতগতিতে সচল রাখতে তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠাই এখন সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন আগামী দিনগুলোতে এই খাতের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। যথাযথ নীতি সহায়তা, জ্বালানি নিশ্চয়তা এবং সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও তার রপ্তানি আয়ের ঈর্ষণীয় অবস্থানে ফিরে আসতে সক্ষম হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা।