প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ মানচিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আভাস নিয়ে এসেছে চীন, মায়ানমার ও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নতুন অর্থনৈতিক করিডর। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের সময় আলোচনার টেবিলে উঠে আসা এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে তা কেবল বাণিজ্যিক যোগাযোগের নতুন পথই তৈরি করবে না, বরং এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। চীনের কুনমিং শহর থেকে মায়ানমারের দুর্গম পথ পেরিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এই করিডরকে বেইজিং তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে দেখছে। তবে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিপরীতে এই প্রকল্পের পথে পাহাড়সম বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে মায়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ।
চীনের সমুদ্রবাণিজ্য বর্তমানে অনেকাংশেই মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভূরাজনৈতিক সংকটে বা অবরোধের মুখে এই সমুদ্রপথ চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলাতেই বেইজিং বহু বছর ধরে বিকল্প করিডরের সন্ধান করছে। মায়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীন-মায়ানমার অর্থনৈতিক করিডর তারই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। এখন বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার অর্থ হলো বঙ্গোপসাগরে চীনের সরাসরি এবং শক্তিশালী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। চীনের এই পরিকল্পনার পেছনে প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো তাদের স্থলবেষ্টিত ইউনান প্রদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত করা, দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত আধিপত্য সুসংহত করা এবং ভারত মহাসাগরে নিজের নৌ-উপস্থিতি স্থায়ী রূপ দেওয়া।
প্রস্তাবিত এই করিডরের রুট এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি, তবে ভূ-কৌশলগত বাস্তবতায় কুনমিং থেকে রুইলি, মুসে, মান্দালয় হয়ে মায়ানমারের রাখাইন অঞ্চল পেরিয়ে টেকনাফ ও কক্সবাজারের মাধ্যমে চট্টগ্রামের বন্দর পর্যন্ত এর বিস্তৃতি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই মাল্টিমোডাল করিডর সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথের এক অনন্য সমন্বয় ঘটাবে। বর্তমানে চীনের পূর্ব উপকূল থেকে সমুদ্রপথে পণ্য চট্টগ্রামে পৌঁছাতে যে সময় ব্যয় হয়, তা করিডরটি চালু হলে নাটকীয়ভাবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসবে। পণ্য পরিবহনের এই অভাবনীয় গতি ও স্বল্প ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। ট্রানজিট হাব হিসেবে বাংলাদেশ নিজেকে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়নে এই করিডর একটি মাইলফলক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা।
তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে মায়ানমারের চলমান অস্থিরতা। রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন আর কেন্দ্রীয় জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, বরং এর বড় একটি অংশ জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির দখলে। মংডু ও বুথিডংসহ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আরাকান আর্মির শক্ত অবস্থান এই করিডর তৈরির পরিকল্পনাকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। করিডরের একটি বড় অংশ যেহেতু রাখাইনের ভেতর দিয়ে যাবে, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিতে জান্তা সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সাথে কার্যকর সমন্বয় ও সমঝোতা ছাড়া কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখবে না। চীন অবশ্য মায়ানমারের সব পক্ষের সাথেই যোগাযোগ বজায় রেখে আসছে এবং ভবিষ্যতে বেইজিং এই অঞ্চলে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অন্যদিকে, এই করিডরকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগের কারণ অত্যন্ত গভীর। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় দিল্লি সব সময়ই সতর্ক। বাংলাদেশের ভেতরে চীনের দীর্ঘমেয়াদি স্থল করিডর গড়ে উঠলে ভারত একে নিজের কৌশলগত পরিসরে বেইজিংয়ের সরাসরি অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখছে। বিসিআইএম করিডর নিয়ে অতীতে ভারতের অনীহা এবং চীন-ভারত বৈরিতার যে ইতিহাস, তা এই নতুন ত্রিপক্ষীয় প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে চীনের গভীর সম্পৃক্ততা বঙ্গোপসাগরে ভারত-চীন প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদিও বলছে তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লির কৌশলগত অস্বস্তি ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
রোহিঙ্গা সংকটও এই করিডর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় মানবিক ও রাজনৈতিক বাধা। করিডর দিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় কাজ শুরু করলেও, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুকে এড়িয়ে গিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন যদিও দাবি করছেন যে করিডরটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে পারে এবং বন্দরের উন্নতির মাধ্যমে প্রাথমিক সুবিধা নেওয়া সম্ভব, তবে বাস্তবে এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ছাড়া শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীরা যে দ্বিধায় থাকবে, তা নিশ্চিত। প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে থাকলেও এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি।
পরিশেষে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মায়ানমার-চীন করিডর কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক পরীক্ষা। একদিকে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, অন্যদিকে মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও প্রতিবেশী ভারতের সাথে কৌশলগত ভারসাম্যের লড়াই। বাংলাদেশ সরকার এই করিডরকে একটি অর্থনৈতিক সংযোগ হিসেবে দেখলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা বৈশ্বিক রাজনীতির হিসাবনিকাশ অত্যন্ত জটিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে পারস্পরিক আস্থার জায়গা তৈরি করা। চীন হয়তো ধাপে ধাপে সীমিত ট্রানজিট দিয়ে যাত্রা শুরু করবে, কিন্তু শত শত মাইল বিস্তৃত এই পথে চলা কতটা মসৃণ হবে, তা নির্ভর করছে মায়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কতটা প্রশমিত হবে তার ওপর। এই করিডর কি দক্ষিণ এশিয়াকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে, নাকি বড় শক্তির প্রতিযোগিতার নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হবে—সেই উত্তর লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের গর্ভেই।