সর্বশেষ :
ইসরাইলের অকৃত্রিম মিত্র ভারত, ভ্যান্সের মন্তব্যে দ্বিমত নেতানিয়াহুর পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি শুরু: উত্তপ্ত বিচারিক অঙ্গন সৌরবিদ্যুতে গুরুত্ব, জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে চায় সরকার ডিসেম্বরেই নতুন বই, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুটিংহীন অবসরে যেভাবে নিজেকে সজীব রাখেন অভিনেত্রী হিমি আমানত আনতে ৪ কোটি টাকার ঘুষ: ডুবছে কমার্স ব্যাংক ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত ভারত: ১০ জনের মৃত্যু, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রেমিকার ঘরে স্ত্রীকে খুন, নেপাল পালানো স্বামী গ্রেফতার পল্লী উন্নয়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর: মির্জা ফখরুল ব্রাজিলকে বিদায় করে নতুন ইতিহাস লিখলেন আর্লিং হলান্ড

পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি শুরু: উত্তপ্ত বিচারিক অঙ্গন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি শুরু: উত্তপ্ত বিচারিক অঙ্গন

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত পঞ্চদশ সংশোধনী এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাঠগড়ায়। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পথে আপিল বিভাগের শুনানি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল পৌনে ১০টায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে শুরু হওয়া এই শুনানিকে কেন্দ্র করে দেশের আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জনমানসে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এই শুনানির রায় সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে কি না—তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

হাইকোর্টের দেওয়া ঐতিহাসিক রায়ের বিরুদ্ধে করা এই আপিল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ এবং রিটকারীদের পক্ষের আইনজীবীরা সংবিধানের বিভিন্ন ধারা ও অনুচ্ছেদ নিয়ে নিজেদের আইনগত অবস্থান তুলে ধরছেন। গত বছরের নভেম্বরে সর্বোচ্চ আদালত যে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছিলেন, তা আজ পূর্ণাঙ্গ শুনানির রূপ পেয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী মূলত ২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাস হয়েছিল, যার মাধ্যমে জাতির পিতাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু এই সংশোধনীর মাধ্যমে আনা বিভিন্ন বিধান সংবিধানের মৌলিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু মন্তব্য। আদালত স্পষ্ট করে বলেছিলেন, গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা কোনোভাবেই দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে বিকশিত হতে পারে না। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে রায়ে বলা হয়েছে যে, সেখানে জনগণের ইচ্ছার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেনি, যার পরিণতি হিসেবেই জুলাই মাসে দেশে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়, বরং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বলে হাইকোর্ট মত দিয়েছিলেন। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর তৎকালীন বেঞ্চের সেই রায় এখন আপিল বিভাগে কতটা টিকে থাকে, তা দেখার অপেক্ষায় সারা দেশ।

শুনানি চলাকালীন আইনি লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন দেশের প্রথিতযশা আইনজীবীগণ। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং রিটকারীদের পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, ড. শরীফ ভূঁইয়া ও অন্যান্যরা তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন। আদালতের এজলাসে এখন চলছে সংবিধানের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের বৈধতা, ৭ক, ৭খ, ৪৪(২) অনুচ্ছেদসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা ৫৪টি সংশোধনী নিয়ে আইনি ব্যবচ্ছেদ। রিটকারী সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই রিটে পক্ষভুক্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই মামলার রায় কেবল আইনি পরিমণ্ডলে নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

হাইকোর্টের আগের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি। বরং আদালত কিছু নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বাতিল করে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করেছিলেন। এখন আপিল বিভাগের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, পুরো সংশোধনীর কোন অংশগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিরূপণ করা। জাতির পিতা বা ২৬ মার্চের ভাষণের স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক না থাকলেও, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমেই মূলত গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে রিটকারীদের দাবি। আদালত যদি রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি পুনরায় সংবিধানে ফিরিয়ে আনে, তবে তা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

দীর্ঘ শুনানির এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটের বিধান যে বিলুপ্ত করা হয়েছিল, তাও ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক বলে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। এই বিধান পুনর্বহালের অর্থ হলো, ভবিষ্যতের যেকোনো বড় সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামতের সুযোগ তৈরি হওয়া। একই সঙ্গে, ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল করা বা ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদের আইনি বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার মীমাংসাও আপিল বিভাগই করবেন। পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, কারণ এটি কেবল একটি আইনের ব্যাখ্যা নয়, বরং এটি দেশের সর্বোচ্চ আইনের মূল চেতনার পুনর্নির্মাণ।

আইনজীবীদের মতে, আপিল বিভাগের এই রায় চূড়ান্ত হওয়ার পরেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা কেমন হবে। বর্তমান শুনানিতে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষই আশা করছে যে, আদালত এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ রায় দেবেন যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের যে প্রত্যাশা—অর্থাৎ একটি প্রভাবমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ—তা এই রায়ের মধ্য দিয়েই সাংবিধানিক সুরক্ষা পেতে পারে। বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থার জায়গা থেকে এই শুনানি এখন দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার আপিল শুনানি কেবল আদালত কক্ষের আইনি লড়াই নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের এক সন্ধিক্ষণ। রাষ্ট্রের উচ্চতর আদালত সংবিধানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের সাথে সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করেন, তা দেখার জন্য পুরো জাতি তাকিয়ে আছে। আইনের শাসনের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতিটি পক্ষ তাদের যুক্তি পেশ করছে, যার চূড়ান্ত ফলাফলই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে। আদালতের নিরপেক্ষ ও দূরদর্শী রায় এই অনিশ্চিত সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে এক বড় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত