সর্বশেষ :
ইসরাইলের অকৃত্রিম মিত্র ভারত, ভ্যান্সের মন্তব্যে দ্বিমত নেতানিয়াহুর পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি শুরু: উত্তপ্ত বিচারিক অঙ্গন সৌরবিদ্যুতে গুরুত্ব, জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে চায় সরকার ডিসেম্বরেই নতুন বই, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুটিংহীন অবসরে যেভাবে নিজেকে সজীব রাখেন অভিনেত্রী হিমি আমানত আনতে ৪ কোটি টাকার ঘুষ: ডুবছে কমার্স ব্যাংক ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত ভারত: ১০ জনের মৃত্যু, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রেমিকার ঘরে স্ত্রীকে খুন, নেপাল পালানো স্বামী গ্রেফতার পল্লী উন্নয়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর: মির্জা ফখরুল ব্রাজিলকে বিদায় করে নতুন ইতিহাস লিখলেন আর্লিং হলান্ড

আমানত আনতে ৪ কোটি টাকার ঘুষ: ডুবছে কমার্স ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
আমানত আনতে ৪ কোটি টাকার ঘুষ: ডুবছে কমার্স ব্যাংক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতির এক অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায়। চরম তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকটি টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টায় যে অনৈতিক ও অবৈধ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে, তা ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসনের জন্য এক অশনি সংকেত। গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে ১০০ কোটি টাকার আমানত বাগিয়ে আনতে ব্যাংকটি ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে চার কোটি টাকা খরচ করেছে, যা মূলত প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলে দেওয়া ঘুষ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। দেশের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক উন্নয়নের নামে এভাবে প্রকাশ্যে সরকারি ও আমানতকারীদের অর্থ লুটপাটের ঘটনা কেবল পেশাদারিত্বের অভাব নয়, বরং এটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য।

ঘটনার গভীরে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, কমার্স ব্যাংকের এই ‘সাফল্যের’ নেপথ্যে রয়েছে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির এক সুপরিকল্পিত জাল। গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে যে ১০০ কোটি টাকা আমানত হিসেবে আনা হয়েছে, তার সুদহার মাত্র আড়াই শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে এটি ব্যাংকের জন্য লাভজনক মনে হলেও, বাস্তবে এই আমানত পেতে চার কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার ফলে প্রকৃত খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশের উপরে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এই চার কোটি টাকা খরচকে ব্যবসায়িক কৌশল বা ‘বিজনেস ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ মহল একে সরাসরি দুর্নীতি হিসেবেই দেখছেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক এই ব্যয়কে অনুমোদন দেওয়া এবং একে সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করা, সংশ্লিষ্টদের নৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ।

ঘুষের এই চার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের কৌশলটিও ছিল অত্যন্ত অভিনব ও জালিয়াতিপূর্ণ। ব্যাংকের ১৩ জন কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে প্রথমে তাদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ‘প্রণোদনা’ বা ইনসেনটিভ হিসেবে টাকা জমা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের চেক আগেভাগেই স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে নগদ টাকা উত্তোলন করা হয়। ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখাসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের এই জালিয়াতিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাকরির ভয় এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশের চাপে অনেক কর্মকর্তা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই অপরাধের অংশ হতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

কমার্স ব্যাংকের এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত ব্যাংকটি চট্টগ্রামের আলোচিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যাদের বিরুদ্ধে গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ব্যাংকটির পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকটির আস্থাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা ৯১৪ কোটি টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকটিকে এক গভীর খাদে নিয়ে গেছে। আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের মতো সমস্যাগ্রস্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কমার্স ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা আটকা পড়ে আছে, যা তাদের তারল্য সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকট নিরসনে কোনো স্বচ্ছ পরিকল্পনা না নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্রমাগতভাবে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আমানতকারীদের মুনাফার বিপরীতে যে কর ও ভ্যাটের টাকা সরকারকে পরিশোধ করার কথা ছিল, তা পরিশোধ না করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজেরা খরচ করে ফেলেছে—যা সরাসরি আইন লঙ্ঘন। একটি ব্যাংক যখন আমানতকারীর মূলধন ফেরত দিতে অক্ষম হয় এবং সরকারকেও রাজস্ব প্রদান করতে পারে না, তখন সেই ব্যাংকের অস্তিত্ব থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টাকা অন্য একটি অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে এই সংকটাপন্ন ব্যাংকে রাখা হয়েছে, যা প্রশাসনের দূরদর্শিতার অভাব এবং দুর্নীতির যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। ঝুঁকি কমানোর অজুহাতে একটি দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকে সরকারি অর্থ স্থানান্তর করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও, সাধারণ মানুষ ও আমানতকারীরা আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও এ ধরনের দুর্নীতির কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখন এক বিশাল ঝুঁকির মুখে। ঘুষ দিয়ে আমানত আনা এবং পরবর্তীতে সেই টাকা দিয়ে নিজেরা অনিয়ম করা—এটি ব্যাংকিং খাতের এক চরম বিপর্যয়ের দলিল। যারা এই ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কেবল তদন্ত নয়, বরং এসব অর্থ লোপাটকারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, কমার্স ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে ভেঙে পড়বে এবং এর দায়ভার পড়বে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর।

পরিশেষে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের সমাধান কেবল ইনজেকশন বা জরুরি ঋণের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন কঠোর সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা। কমার্স ব্যাংকের এই চার কোটি টাকার জালিয়াতি সেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং দুদকসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার এখন উচিত এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা। দেশের আর্থিক খাতকে একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হলে, এ ধরনের দুর্নীতিবাজদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষাই হওয়া উচিত যেকোনো ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কমার্স ব্যাংকের চিত্র আজ তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত