প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সম্পর্ক সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবে সাম্প্রতিক এক কূটনৈতিক বিতর্কে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের করা ‘যুক্তরাষ্ট্রই ইসরাইলের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র’—এই মন্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা করে নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারত ইসরাইলের এক অকৃত্রিম ও শক্তিশালী বন্ধুরাষ্ট্র। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তিনি একদিকে যেমন মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি তার শ্রদ্ধাশীল অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন, অন্যদিকে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়ে ভারতের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখেও নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মিত্রতার প্রশ্নে তিনি কেবল একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল হতে নারাজ। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ইসরাইলের সবথেকে বড় বন্ধু হিসেবে গণ্য করা হলেও, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সকল বক্তব্যের সাথে একমত হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। মূলত কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মন্তব্য করেছিলেন যে, ইসরাইলের উচিত তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো ধরনের বিরোধে না জড়ানো। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত সমঝোতা স্মারকের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে ভ্যান্স এই মন্তব্যটি করেছিলেন। তবে নেতানিয়াহুর এই সরাসরি দ্বিমত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, ইসরাইল তার ভূ-কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পেছনে ভারতের সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের গড়ে ওঠা নিবিড় সম্পর্ক ও অংশীদারিত্বের বিষয়টি স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত ও ইসরাইল এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। নেতানিয়াহু দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ভারতবাসীর পক্ষ থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ সমর্থন পাচ্ছেন। ১৪০ কোটির এই বিশাল জনশক্তির সমর্থন ইসরাইলের জন্য কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, বরং নৈতিকভাবেও অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরাইলবিরোধী জনমত তৈরির যে প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বর্তমানে একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, ভারতের মতো দেশের অকৃত্রিম সমর্থন সেই নেতিবাচক স্রোতকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে নেতানিয়াহু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে অনেক দেশেই ইসরাইলবিরোধী প্রচারণা চালানোর এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বা ফ্যাশন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রচারণার নেপথ্যে থাকা অনেক দেশের সরকারপ্রধানরা ব্যক্তিগতভাবে বা গোপনে তার সাথে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাইরের চাকচিক্য বা রাজনৈতিক স্লোগান দেখে বাস্তব সম্পর্ককে বিচার করা ভুল হবে। পর্দার অন্তরালে অনেক দেশের সাথেই ইসরাইলের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে, যা জনসমক্ষে আসার সময় এখনো হয়তো আসেনি। কিন্তু ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি তিনি অত্যন্ত সগর্বে ও প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেছেন, যা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করেছে।
বর্তমান বিশ্বে গাজা, লেবানন ও ইরানের সাথে সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু এক কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে থাকা এই সময়ে ভারতের মতো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বের ওপর জোর দেওয়া তাঁর এই রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পটপরিবর্তন বা নীতিগত পরিবর্তনের সাথে সাথে ইসরাইলের পররাষ্ট্রনীতি যে আর একমুখী নয়, তা আজ নিশ্চিত। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের মতো বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তার সমপর্যায়ের সহযোগী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য ভারতের ক্রমবর্ধমান বিশ্ব প্রভাবের স্বীকৃতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারত বরাবরই ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছে। তবে নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য ঘোষণা ভারতের সাথে ইসরাইলের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতাকে আরও নতুন করে উসকে দিয়েছে। বন্ধুত্বের এই সম্পর্ক কেবল সামরিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জনগণের আবেগ ও পারস্পরিক বিশ্বাসের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ১৪০ কোটি মানুষের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে নেতানিয়াহু মূলত বিশ্বশক্তির কাছে একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, একঘরে হওয়ার ভয় ইসরাইল আর করে না।
পরিশেষে বলা যায়, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, বরং এটি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত। মিত্রতার সংজ্ঞা যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তা এই বিতর্কের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের প্রধান শক্তি হিসেবে স্বীকার করার পাশাপাশি ভারতের মতো বন্ধুকে ‘শক্তিশালী মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করা ইসরাইলের পররাষ্ট্রনীতির এক বড় বিবর্তন। আগামী দিনগুলোতে গ্লোবাল সাউথ এবং পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক কীভাবে গড়ে ওঠে, তা এই ধরনের কূটনৈতিক আলাপের ওপর নির্ভর করবে। তবে আপাতত, ১৪০ কোটি ভারতীয়র সমর্থনের ওপর নেতানিয়াহুর এই আস্থাশীল বক্তব্য ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্কের একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।