সম্মানের সাথে কথা বলুন, অন্যথায় ভিন্ন ভাষায় জবাব: ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ বার
সম্মানের সাথে কথা বলুন, অন্যথায় ভিন্ন ভাষায় জবাব: ইরান

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দানে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাগ্‌যুদ্ধ তুঙ্গে উঠেছে। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের ৯ কোটি ১০ লক্ষ মানুষকে হুমকি দেওয়ার ধৃষ্টতা সহ্য করা হবে না এবং প্রয়োজনে তেহরান তার নিজস্ব ও কার্যকর ভাষায় জবাব দিতে প্রস্তুত।

গত সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধে যেকোনো উপায়ে জয়লাভ করবে। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরান হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তিতে আবদ্ধ হবে, নতুবা ওয়াশিংটন তার ভাষায় ‘কাজটি শেষ করে দেবে’। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘কাজটি শেষ করার’ বিষয়টি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

এই মন্তব্যের পরপরই মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক অবস্থাকে ‘বিভ্রান্ত’ বলে অভিহিত করেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে বলেন, একটি দেশ হিসেবে আমেরিকার ইতিহাস মাত্র ২৫০ বছরের, যা ঐতিহাসিকভাবে শিকড়হীন। এর বিপরীতে ইরানের সভ্যতা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। অতীতেও যখন মার্কিন পক্ষ থেকে ইরানের সভ্যতা মুছে ফেলার মতো আপত্তিকর কথাবার্তা বলা হয়েছিল, তখন তার পরিণতি হয়েছিল শোচনীয় পরাজয় ও অসহায়ত্ব। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার জন্য মরিয়ে হয়ে আবেদন করতে হয়েছিল। যুলঘাদর মনে করিয়ে দেন যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরানি জাতি বংশপরম্পরায় বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও হুমকির মোকাবিলা করে অভ্যস্ত। তাই বাইরের দেশগুলোর হুমকির ভাষায় তারা বিচলিত হয় না। বরং এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ইরানের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের সুর আরও জোরালো করে। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে একটি সুস্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়ে বলেন, ইরানের সাথে যদি কোনো আলোচনা করতে হয়, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। অসম্মানজনক বা ধমকের ভাষা ব্যবহার করলে ইরান তার নিজস্ব কৌশলে ভিন্ন ভাষায় উত্তর দিতে পিছপা হবে না।

ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নীতি হলো নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে চাপে রাখা। কিন্তু ইরান তার নিজস্ব আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে অটল থাকার বিষয়ে বরাবরই আপসহীন। তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে, তাদের দেশ কোনো বিদেশি শক্তির ধমক বা প্ররোচনার কাছে মাথা নত করবে না। মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদরের এই বক্তব্য সেই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানেরই প্রতিফলন। ইরান কেবল কথার লড়াইয়ে বিশ্বাসী নয়, বরং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার জন্য তারা যে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সুচিন্তিত প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তখন ট্রাম্পের মতো ক্ষমতাধর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এমন উস্কানিমূলক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যেভাবে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। ইরানের গর্বিত জনগণ তাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বলে বারবার ঘোষণা দিয়ে আসছে। তেহরানে খামেনির শোক র‌্যালি কিংবা বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিদেশি হুমকির মুখে ইরান জাতি হিসেবে কতটা ঐক্যবদ্ধ।

সংবাদটি প্রকাশের পর থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কূটনৈতিক চ্যানেলে সমাধান না খুঁজে যুদ্ধের হুমকি অব্যাহত রাখে, তবে তা কেবল ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদরের এই কঠোর প্রতিক্রিয়া আসলে ওয়াশিংটনের সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত সতর্কতা। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসন এই হুঁশিয়ারি কতটুকু গুরুত্বের সাথে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসে কি না।

ইরানের পক্ষ থেকে আসা এই বিবৃতিটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের প্রকাশ নয়, বরং এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার আত্মমর্যাদা রক্ষার সংকল্প। তারা প্রমাণ করতে চায় যে, ভৌগোলিক সীমানা বা শক্তির পরিমাপে ছোট হোক বা বড়, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রকেই হুমকির মুখে ফেলা সমীচীন নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের নিরাপত্তা সচিবের এই বাক্‌যুদ্ধ এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান তার অবস্থানে অটল থেকে বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে যে, শান্তি বা সংঘর্ষ—যেকোনো পথেই হাঁটতে তারা প্রস্তুত, তবে তা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত