প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বন্দর থেকে গত চার বছরে আমদানি করা পণ্যবোঝাই ২৫০টি কনটেইনারের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতের দুই প্রধান স্তম্ভ—বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। একে অপরকে দোষারোপ করে সরকারি এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি চিঠি চালাচালি। আর এই প্রশাসনিক সংকটের নেপথ্যে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক মহলে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
বিষয়টি সামনে আসে যখন কাস্টমস হাউজ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ধারাবাহিকভাবে ছয়টি চিঠি পাঠানো হয়। কাস্টমসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে খালাস স্থগিত বা ‘লক’ করে রাখা ২৫০টি কনটেইনারের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো সদুত্তর দিতে পারছে না। কাস্টমসের ভাষ্যমতে, সন্দেহজনক পণ্য, রাজস্ব ফাঁকি বা চোরাচালানের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্দেশে এই কনটেইনারগুলো কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেগুলোর কোনো হদিস মিলছে না। ২০২১ সালে ৮৩টি, ২০২২ সালে ৬১টি, ২০২৩ সালে ৪০টি এবং ২০২৪ সালে ৬৬টি কনটেইনারের অবস্থান অস্পষ্ট থাকায় কাস্টমস গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যচালানের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য ও পূর্ববর্তী রেকর্ড যাচাই-বাছাই করেই তারা পুরো চালানে লক দিয়ে থাকেন। এই লক করা পণ্য বন্দর থেকে কোনোভাবেই কাস্টমসের অনুমতি ছাড়া খালাস হওয়ার কথা নয়। এমতাবস্থায় এত বিপুল সংখ্যক কনটেইনারের সঠিক তথ্য দিতে না পারাটা এক ধরণের অবহেলা কিংবা কোনো গভীর অশুভ যোগসাজশের ইঙ্গিত বহন করে। কাস্টমস চায় এর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পুরো বিপরীত। বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো কনটেইনারই বন্দর থেকে হারিয়ে যায়নি। তাদের দাবি, কাস্টমসের অভিযোগে উল্লেখ করা ২৫০টি কনটেইনারের মধ্যে ১৬৪টি পণ্যচালানে মোট ২৯৩টি এফসিএল বক্স এবং ৮৩টি পণ্যচালানে এলসিএল কার্গো রয়েছে। এর মধ্যে নিয়ম মেনেই কাস্টমসের আউটপাসের মাধ্যমে ৮৮টি কনটেইনার যথাযথ প্রক্রিয়ায় ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৭০টি কনটেইনার বিভিন্ন প্রাইভেট অফডকে স্থানান্তরের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ১৩১টি কনটেইনার এখনো বন্দরের ইয়ার্ডে সংরক্ষিত আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের আরও অভিযোগ, কাস্টমসের পাঠানো তালিকায় অন্তত ৪০টি চালানের বিল অব এন্ট্রি বা বিএল নম্বরের তথ্য ভুল রয়েছে, যার ফলে কনটেইনার খুঁজে পেতে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
এই বিতর্কিত পরিস্থিতির ফলে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বড় ধরণের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সময়মতো পণ্য হাতে না পাওয়ায় অনেক আমদানিকারককে মোটা অংকের জরিমানা ও ব্যবসা সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টম এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম বলেন, কনটেইনার উধাও হওয়ার বা তথ্যের গরমিল হওয়ার পেছনে কোনো অসাধু চক্র কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। যদি কাস্টমসের লক করা পণ্য বন্দর থেকে বের হয়ে গিয়ে থাকে, তবে তা নিরাপত্তার মারাত্মক ত্রুটি। এটি দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব খাতের জন্য একটি বড় হুঁশিয়ারি বার্তা।
বন্দরের নিরাপত্তা বলয় অত্যন্ত সুসংহত হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এই তথ্যের অমিল ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাফার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন মনে করেন, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অনেক সময় কনটেইনারে অবৈধ পণ্য আনা হয়, আবার পরবর্তীতে সঠিক নথিপত্র না থাকায় কাস্টমস ও বন্দর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। তিনি বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা চায় স্বচ্ছতা। কোনো আমদানিকারক যেন হয়রানির শিকার না হন এবং একই সাথে দেশের রাজস্ব যেন কোনোভাবেই ফাঁকি না দেওয়া হয়। এ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি বছর ৩৪ থেকে ৩৫ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। প্রতিটি কনটেইনার বন্দরে প্রবেশের সময় থেকে শুরু করে ডেলিভারি পর্যন্ত অন্তত চার স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং ডিজিটাল নজরদারির মধ্য দিয়ে যায়। এছাড়া অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি পণ্যের প্রতিটি ধাপ আপডেট করা হয়। এমন একটি আধুনিক ও কঠোর নজরদারি ব্যবস্থায় কনটেইনার হারিয়ে যাওয়ার দাবি কতটা যৌক্তিক বা কাস্টমস ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ে কী ধরণের ঘাটতি রয়েছে, তা নিয়ে এখন বড় ধরণের তদন্তের দাবি উঠছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে এই মতপার্থক্য মূলত সিস্টেমের তথ্যের অসামঞ্জস্যতা থেকে উদ্ভূত হতে পারে। যেহেতু বিষয়টি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বন্দর সংশ্লিষ্ট এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব জড়িয়ে আছে, তাই এই দ্বন্দ্ব নিরসনে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রশাসন যদি সময়মতো এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান না ঘটায়, তবে বন্দরের ওপর বিদেশি বায়ারদের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। আশা করা যায়, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই দুই কর্তৃপক্ষ আলোচনার টেবিলে বসে প্রতিটি কনটেইনারের অডিট রিপোর্ট নিশ্চিত করবে এবং এই অহেতুক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে বন্দরের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে।