পঞ্চদশ সংশোধনী: আপিল বিভাগে চলছে দ্বিতীয় দিনের শুনানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১০ বার
পঞ্চদশ সংশোধনী: আপিল বিভাগে চলছে দ্বিতীয় দিনের শুনানি

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত মামলার আইনি লড়াই এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ এই সংশোধনীর বেশ কিছু বিতর্কিত ধারা অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের শুনানি আজ দ্বিতীয় দিনের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে এই শুনানির দিকে এখন সারা দেশের মানুষের নজর নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে, কারণ এই রায়ের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী দিনের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর রূপরেখা।

মঙ্গলবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বেঞ্চে এই শুনানি শুরু হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে রিটকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও ড. শরীফ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একদল আইনজীবী। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো রক্ষা এবং গণতন্ত্রের পথকে নির্বিঘ্ন করার লক্ষে উভয় পক্ষই তাদের আইনি যুক্তি উপস্থাপন করছেন।

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বেশ কিছু অংশ অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, গণতন্ত্র হলো আমাদের সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। রায়ে বলা হয়েছে, অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে জনগণের ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি, যা সাধারণ মানুষের মনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। আর এই আস্থার অভাব থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেছেন।

হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে জনগণের অভিপ্রায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তি সংক্রান্ত ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ বাতিল করে আদালত একে গণতন্ত্র ধ্বংসকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। এছাড়া ৭ ক, ৭ খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদসমূহ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় তা বাতিল করা হয়েছে। আদালত তার রায়ে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন, যা অতীতে বাতিল করা হয়েছিল। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে থাকা গণভোটের ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করার এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।

তবে আদালত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি ঢালাওভাবে বাতিল করেননি। জাতির পিতার স্বীকৃতি ও ২৬ মার্চের ভাষণের মতো কিছু বিষয় নিয়ে পরবর্তী সংসদ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে রায়ে পথ খোলা রাখা হয়েছে। আদালতের এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা ধরে ঘোষিত এই রায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

বর্তমানে আপিল বিভাগে যে শুনানি চলছে, সেখানে রিটকারীদের পক্ষ থেকে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হচ্ছে। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইনসানিয়াত বিপ্লবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই আপিল প্রক্রিয়ায় পক্ষভুক্ত হয়েছে। এই বিশাল পরিসরের আইনি লড়াই প্রমাণ করে যে, সংবিধানের এই সংশোধনী নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি উভয় জগতেই কতটা গভীর উদ্বেগ ও ভিন্নমত রয়েছে।

২০১১ সালে তৎকালীন জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়েছিল এবং জাতির পিতার স্বীকৃতির পাশাপাশি নারীদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এর রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক দানা বেঁধেছে। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ অন্য আইন কর্মকর্তারা সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান তুলে ধরছেন। অপরদিকে রিটকারী পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, সংবিধানকে সংশোধন করার ক্ষমতা সংসদের থাকলেও, তা দেশের মৌলিক কাঠামোকে বিনষ্ট করতে পারে না।

শুনানি চলাকালীন আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করছেন যে, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় দেশে সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে। দেশের সাধারণ মানুষও তাকিয়ে আছে সর্বোচ্চ আদালতের দিকে, যেখানে গণতন্ত্রের সুরক্ষায় একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রত্যাশা রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রূপরেখা পেতে আপিল বিভাগের এই রায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।

আদালতের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা ও সতর্ক নজরদারি লক্ষ্য করা গেছে। আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের উপচে পড়া ভিড় এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহ থেকেই বোঝা যায়, এই মামলাটি কতটা স্পর্শকাতর। সাংবিধানিক এই সংকট নিরসনে বিচার বিভাগ যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছে, তা দেশের বিচারিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর মানুষের আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। আপিল বিভাগের এই শুনানি কখন শেষ হবে এবং চূড়ান্ত রায়ে কী বার্তা উঠে আসবে, তা জানার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো জাতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত