প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রকৃতির অমোঘ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানের লামা উপজেলা আজ শোকের মাতমে স্তব্ধ। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি যখন ভিজে নরম হয়ে উঠেছিল, ঠিক সেই সুযোগেই ধেয়ে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন, যারা ছিলেন একই পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশী। ঘুমের ঘোরেই মাটির নিচে চাপা পড়া এই মানুষগুলোর করুণ মৃত্যু স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি যেন পাহাড়ি জনপদের সেই চিরচেনা বিপদের প্রতিচ্ছবি, যা প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে অসহায় মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার ভোর চারটার দিকে। যখন পুরো এলাকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মিশনপাড়ায় আকস্মিক পাহাড়ের বিশাল এক অংশ ধসে পড়ে। নিমিষেই মাটির নিচ থেকে উঠে আসা বিশাল স্তূপ দুটি বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে মো. ইউনুস, তার স্ত্রী রানু আক্তার এবং তাদের চার বছরের শিশুপুত্র মো. সোলেমান ঘটনাস্থলেই মাটিচাপা পড়েন। একইসঙ্গে চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে জীবিকার তাগিদে আসা মো. জুয়েল এবং তার স্ত্রী কুলছুমা আক্তারও এই মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হন। ঘুমের মধ্যে এমন ভয়াবহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া পরিবারগুলোর স্বপ্ন আজ ধুলোয় মিশে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পরপরই চারদিকে আর্তনাদ আর কান্নার রোল পড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পুলিশ সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে একে একে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু তখন তাদের কারো দেহেই প্রাণের স্পন্দন ছিল না। লোহাগড়া উপজেলার মা মনি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রেহানা বেগম নামে এক ইউপি সদস্যের অবস্থাও গুরুতর। একই রাতে পৃথক আরেকটি পাহাড়ধসে তার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর স্থানীয়দের চেষ্টায় তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কাইছার হামিদ জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মরদেহগুলো আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পাহাড়ের কোলে বসবাস করা মানুষগুলো তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আর সঞ্চয় দিয়ে যে ঘরগুলো তৈরি করেছিলেন, প্রকৃতির এক নিমেষের তাণ্ডবে তা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের এই இழাপ অপূরণীয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন এই ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, গত চারদিন ধরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং এবং প্রচারণার মাধ্যমে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু জীবন জীবিকার প্রয়োজনে অনেকেই সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে দুর্গম পাহাড়ে রয়ে গেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও পরিণতি এমন ভয়াবহ হবে তা কেউ ভাবেননি। তিনি আরও জানান, নিহতদের পরিবারকে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলায় টানা বর্ষণের ফলে এখন সর্বত্র এক অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে। কেবল লামা নয়, জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এখনো অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। জেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানকারী সকল বাসিন্দাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে নদীপথের স্রোত বেড়ে যাওয়ায় নৌ ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
পাহাড়ের মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হলেও প্রকৃতি যখন এমন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তখন মানুষের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে ধরা দেয়। যারা জীবনের প্রয়োজনে শহরে বা দূরবর্তী এলাকা থেকে এসে পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের এই মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। পাহাড়ি ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে স্থায়ীভাবে মানুষের বসতি স্থাপন ঠেকাতে টেকসই পরিকল্পনা ও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কেবল মাইকিং বা প্রচারণায় মানুষ নিরাপদ হয় না, তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি।
আজকের এই শোকাবহ ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকা কত কঠিন। নিহতদের স্মরণে আজিজনগর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি পরিবারের তিন সদস্যসহ পাঁচজনের প্রাণহানির এই ঘটনা যেন পার্বত্য অঞ্চলের সব মানুষের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে রইল। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং উদ্ধার তৎপরতা শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ঝরনা, পাহাড়ি ঢাল আর বৃষ্টির এই দিনে বান্দরবান যেন এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস আর বেদনার নাম। এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি যেন আল্লাহ এই অসহায় পরিবারগুলোকে দান করেন, এই প্রার্থনা আজ সবার।