সর্বশেষ :

ফ্রান্স-মরক্কো দ্বৈরথ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি মধুর প্রতিশোধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ২৮ বার
ফ্রান্স-মরক্কো দ্বৈরথ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি মধুর প্রতিশোধ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর উন্মাদনা এখন তার চূড়ান্ত শিখরে। গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশ আর শেষ ষোলোর স্নায়ুচাপ কাটিয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন প্রস্তুত কোয়ার্টার ফাইনালের মহারণের জন্য। আজ বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন একটি ম্যাচ, যাকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের পারদ তুঙ্গে। বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্স মুখোমুখি হতে যাচ্ছে উত্তর আফ্রিকার অদম্য শক্তি মরক্কোর। এই ম্যাচটি কেবল একটি কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, বরং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালের এক জীবন্ত পুনরাবৃত্তি। সেবার মরক্কোর রূপকথার মতো পথচলা থামিয়ে ফাইনালে নাম লিখিয়েছিল ফরাসিরা। এবার বোস্টনের মাঠে সেই হারের ক্ষত মুছে প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় মত্ত ‘আটলাস লায়ন্স’খ্যাত মরক্কো।

দিদিয়ের দেশমের প্রশিক্ষণে ফ্রান্স গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। ২০১৮ সালের শিরোপা জয় এবং ২০২২ সালে ফাইনালে খেলার পর তারা এখন টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছানোর লক্ষ্যে অটল। এই কীর্তি গড়ার পথে তারা যদি মরক্কোকে হারাতে পারে, তবে ফুটবলের ইতিহাসে জার্মানি ও ব্রাজিলের পাশে নিজেদের নাম লিখিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে ফরাসিরা। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে টানা সাতটি জয়ের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা ফ্রান্সকে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রেখেছে। যদিও শেষ ষোলোর লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, তবুও শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলেই ১-০ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে তারা।

এমবাপ্পের ফর্ম ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। চলতি টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে তিনি সাতটি গোল করেছেন এবং নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে গোলদাতার তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। কেবল গোল করাই নয়, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি এবং অ্যাসিস্ট করার ক্ষেত্রেও তিনি সমান পারদর্শী। ফ্রান্সের নতুন সেনসেশন মাইকেল অলিস তার প্রথম বিশ্বকাপেই রেকর্ড বই ওলটপালট করে দিচ্ছেন। ১৯৭৮ সালের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক বিশ্বকাপেই ড্রিবলিং, সুযোগ তৈরি এবং নিখুঁত থ্রু বলের মাধ্যমে অলিস নিজেকে বিশ্বমঞ্চে এক বিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এমবাপ্পে ও অলিসের এই যুগলবন্দি মরক্কোর রক্ষণভাগের জন্য হতে পারে এক মহাবিপর্যয়ের কারণ।

অন্যদিকে মরক্কোর চিত্রটি গত চার বছরের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাতার বিশ্বকাপে থিও হার্নান্দেজ ও রান্ডাল কোলো মুয়ানির গোলের আঘাতে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল, কিন্তু মোহামেদ ওয়াহবির শিষ্যরা এখন অনেক বেশি পরিপক্ব ও আত্মবিশ্বাসী। শেষ ষোলোর ম্যাচে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা জানান দিয়েছে যে, তারা কেবল অংশগ্রহণ করার জন্য আসেনি, শিরোপার দাবিদার হিসেবেই এসেছে। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পাঁচটি ম্যাচে অপরাজিত থাকার আফ্রিকান রেকর্ড গড়া মরক্কো এখন নতুন ইতিহাসের অপেক্ষায়। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ব্রাহিম দিয়াজ এবং পিএসজির ডিফেন্স সেনসেশন আশরাফ হাকিমি দলের মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে হাকিমি গত দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি যেভাবে আক্রমণভাগে সুযোগ তৈরি করছেন, তা আধুনিক ফুটবল কৌশলের এক বিস্ময়কর উদাহরণ।

ম্যাচের আগে ইনজুরি নিয়ে উভয় দলের কোচই বেশ চিন্তিত। মরক্কোর অন্যতম ভরসা বায়ার্ন মিউনিখের ইসমাইল সাইবারি উরুর চোটে পড়ে মাঠের বাইরে, যা দলটির জন্য একটি বড় ধাক্কা। সেই সঙ্গে ডিফেন্ডার চাদি রিয়াদের হাঁটুতে চোট থাকায় মরক্কোর রক্ষণভাগ নিয়ে কোচকে নতুন করে ছক কষতে হচ্ছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের মাঝমাঠে অহেলিয়াঁ চুয়ামেনির খেলা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পিঠের চোটে আক্রান্ত সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবার ফিটনেস নিয়ে দিদিয়ের দেশমের উদ্বেগও কম নয়। তবে এত সব প্রতিকূলতার মধ্যেও উভয় দলই জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে ফ্রান্স ও মরক্কোর লড়াইয়ে ফরাসিরা এগিয়ে থাকলেও, বর্তমান সময়ে আফ্রিকান দলগুলোর বিপক্ষে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক রেকর্ড বেশ উদ্বেগজনক। এই শতাব্দীতে ফ্রান্স বিশ্বকাপে যতবার হেরেছে, তার অর্ধেকই এসেছে আফ্রিকান দলগুলোর কাছ থেকে। অপ্টা সুপার কম্পিউটারের পরিসংখ্যান বলছে ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৬০.৯ শতাংশ হলেও, মরক্কোর জয়ের সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া, ম্যাচটি যদি অতিরিক্ত সময় কিংবা পেনাল্টি শুটআউটে গড়ায়, তবে ভাগ্য যে কোনো দিকেই মোড় নিতে পারে।

এই ম্যাচটি ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের জন্যও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। কোচ হিসেবে এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপে তার ২৫তম ম্যাচ। জার্মানির কিংবদন্তি কোচ হেলমুট শোনের সর্বোচ্চ ম্যাচ পরিচালনার রেকর্ডের পাশে আজ নিজের নাম লেখাবেন দেশম। সব মিলিয়ে বোস্টন স্টেডিয়ামে আজ রাতে এক ধ্রুপদী লড়াইয়ের অপেক্ষায় বিশ্ব। একদিকে ফ্রান্সের টানা তিন সেমিফাইনালের স্বপ্ন, অন্যদিকে মরক্কোর প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ফুটবল বিশ্ব আজ সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের, যেখানে জয়ী দল সেমিফাইনালে মোকাবিলা করবে স্পেন অথবা বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। ফুটবল প্রেমীদের হৃদস্পন্দন এখন বোস্টনের সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে, যেখানে নির্ধারিত হবে বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী গল্পের নায়ক কে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত