সর্বশেষ :

আর্জেন্টিনা ম্যাচে পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিং: ফিফার দ্বারস্থ মিসর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ২৮ বার
আর্জেন্টিনা ম্যাচে পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিং: ফিফার দ্বারস্থ মিসর

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বের মহানাটকীয় লড়াইয়ের রেশ এখনো কাটেনি, তবে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচটি এখন বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ৩-২ গোলের সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে মিসরের পরাজয়টি কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে এক গভীর আইনি ও নৈতিক দ্বন্দ্বে। মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ) স্পষ্টভাবে দাবি করেছে, সেই ম্যাচে তারা অন্যায্য এবং চরম পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিংয়ের শিকার হয়েছে। এই অভিযোগে ক্ষুব্ধ মিসর আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফার দ্বারস্থ হয়েছে এবং ম্যাচের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

ম্যাচটির ঘটনাপ্রবাহ ছিল রূপকথার মতো। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে মিসর যখন সেমিফাইনালের পথে এক পা বাড়িয়ে রেখেছিল, তখনই শুরু হয় নাটকীয় মোড়। মাত্র ১৪ মিনিটের ব্যবধানে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে মিসরের রক্ষণভাগ। শেষ পর্যন্ত ৩ গোল হজম করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে হার মানতে হয় তাদের। এই হারের বেদনা ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে রেফারির বিতর্কিত সব সিদ্ধান্তের প্রভাব। বিশেষ করে ৫৮ মিনিটে মিসরের একটি গোল ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাতিল করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে সিদ্ধান্ত দেন যে, গোলটির ঠিক আগে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন মিসরীয় মিডফিল্ডার মারওয়ান আত্তিয়া। ইএফএ-এর দাবি, এই সিদ্ধান্তটি ছিল ভিত্তিহীন এবং এটি ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল।

মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বুধবার প্রকাশিত কড়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের জাতীয় দলের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় তারা কোনোভাবেই আপস করবে না। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, মাঠের সেই প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তগুলো ফুটবলের নিরপেক্ষতা ও সততার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ইএফএ-এর দাবি, কেবল তারা নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষক ও নামি বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত ম্যাচের রেফারিং নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো এমন মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিং কখনোই কাম্য নয়, আর তাই তারা ফিফার কাছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। মিসরীয় ফুটবল সমর্থক ও খেলোয়াড়দের বুকভাঙা কষ্টকে ধারণ করেই তারা এই প্রতিবাদ জানাচ্ছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ম্যাচের পর মিসরের হেড কোচ হোসাম হাসান যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা ছিল অভূতপূর্ব। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, মেসি ও আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি তিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, হয়তো তারা চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক এবং মেসি যেন প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে না যান। এই অভিযোগ বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনা ভক্তদের মধ্যেও বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাঠের ডাগআউটে কোচ হোসাম হাসানের সেই প্রতিবাদের ভঙ্গি—দুই হাত আড়াআড়ি করে ইংরেজি ‘এক্স’ চিহ্ন দেখানো—ছিল এক গভীর হতাশা ও প্রতিবাদী বার্তার প্রতীক।

আর্জেন্টিনার ফিরে আসার গল্পটি অবশ্যই ফুটবলীয় দক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ। ৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং ৮৩ মিনিটে অধিনায়ক লিওনেল মেসির গোলে সমতায় ফেরার পর, যোগ করা সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজের গোলটি আর্জেন্টিনাকে উল্লাসে মাতিয়েছিল। কিন্তু সেই উল্লাসের আড়ালে মিসরীয় ফুটবলারদের দীর্ঘশ্বাস আজও ফুটবল ভক্তদের নাড়া দিচ্ছে। ইএফএ-এর অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে রেফারির সিদ্ধান্তগুলো আর্জেন্টিনার প্রতি নমনীয়তা এবং মিসরের প্রতি কঠোরতার পরিচয় দিয়েছে, যা ফুটবলের সমতার নীতিকে লঙ্ঘন করেছে।

এই ঘটনাটি ফুটবলের প্রযুক্তিগত ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা নিয়েও এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি যদি মাঠে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। মিসরের দাবি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও রেফারির বিচারবুদ্ধি—উভয় ক্ষেত্রেই সেদিন বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটেছিল। তারা মনে করে, সেই বাতিল হওয়া গোলটিই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট, যা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে। মিসর এখন চায় ফিফা যেন ভিডিও ফুটেজগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার একটি সঠিক সুরাহা করে।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে হার ও জয়ের ব্যবধান সাধারণত খুব সামান্যই থাকে। কিন্তু সেই ব্যবধান যখন মাঠের খেলার বদলে রেফারির বাঁশিতে নির্ধারিত হয়, তখন তা খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করে। মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কেবল তাদের পরাজয়ের শোকের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তারা একটি নৈতিক লড়াই লড়ছে। তাদের মতে, মিসরের জার্সি পরা প্রতিটি খেলোয়াড় এবং পেছনে থাকা কোটি সমর্থক মাঠে সমান সুযোগ ও ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। এই দাবি কেবল মিসরের জন্য নয়, বরং সব দেশের জন্য এক সতর্কবার্তা।

সবশেষে, মিসরীয় ফুটবলের এই কান্না কি ফিফার অন্দরমহলে সাড়া ফেলবে? ঐতিহাসিকভাবে ফিফা এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে কঠোর তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, আটলান্টার ওই ম্যাচের বিতর্কিত রেফারিং বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মিসরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এই আইনি পদক্ষেপ ফুটবল বিশ্বের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তির ছোঁয়া থাকলেও মানুষের ভুল বা পক্ষপাতিত্ব কীভাবে একটি দলের স্বপ্ন ধ্বংস করতে পারে। ফুটবল বিশ্ব এখন কেবল নিরপেক্ষ বিচারের অপেক্ষায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত