প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হলো নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে সংঘটিত এক দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনায়। বুধবার রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোলপ্লাজা সংলগ্ন পুলিশ চেকপোস্টের অদূরে জাপান প্রবাসী এক দম্পতির মাইক্রোবাস থামিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল ৩০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ লুট করেছে। এই নৃশংস ঘটনায় কেবল তাদের মূল্যবান সম্পদই খোয়া যায়নি, বরং তাদের জাপান ফেরার স্বপ্ন ও দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে গেছে। মহাসড়কের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট থাকার পরও এমন ঘটনা জননিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলা ও অপরাধীদের বেপরোয়া অবস্থারই ইঙ্গিত দেয়।
ভুক্তভোগী আরমান মিয়া তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ফেনী থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল জাপানে ফিরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তারা যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকায় পৌঁছান, তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা। ঠিক সেই মুহূর্তে ৫-৬ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল দেশীয় অস্ত্র, চাপাতি, ছুরি ও লোহার রড নিয়ে তাদের মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে। ডাকাতদের অতর্কিত আক্রমণে পরিবারটি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গাড়ির যাত্রীদের মারধর করা হয় এবং তাদের সাথে থাকা ১৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, একটি আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্সসহ তিনটি আধুনিক স্মার্টফোন এবং নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। লুট হওয়া স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য ৩০ লাখ টাকারও বেশি।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবারটি এতটাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে যে তাদের বিদেশ যাত্রা এখন অনিশ্চিত। একজন প্রবাসী যখন তার কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সম্পদ নিয়ে নিজের দেশে এসে এভাবে সর্বস্বান্ত হন, তখন তা কেবল একটি অপরাধের ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের সম্মান ও প্রবাসীদের আস্থার ওপর বড় আঘাত। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক মোটরসাইকেল আরোহী জানান যে, তিনি ওই পথে যাওয়ার সময় চাপাতি হাতে কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ের কারণে সামনে আগানোর সাহস করেননি। এই থেকে বোঝা যায়, ডাকাত দলটি কতটা পরিকল্পিত এবং তাদের মধ্যে পুলিশের ভয় কতটা কম ছিল। মহাসড়কের পাশে চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও ডাকাতরা যেভাবে অস্ত্র নিয়ে নির্বিঘ্নে অপারেশন চালিয়েছে, তা স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও তদারকি নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার পরপরই বিভিন্ন থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত মূল অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামীম শেখ জানিয়েছেন যে, ঘটনাটি মহাসড়কের মূল সড়কে নয়, বরং পাশের একটি নিচু সড়কে ঘটেছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার জানিয়েছেন যে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করছেন। তবে পুলিশ চেকপোস্টের এত কাছাকাছি এমন একটি ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছে না থাকাটা সাধারণ মানুষের মনে একরাশ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) দীপংকর ঘোষ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সোনারগাঁ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
এই ধরনের ডাকাতির ঘটনা মহাসড়কে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রী এবং বিশেষ করে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য এক আতঙ্কজনক সংকেত। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, অথচ আজ তারা নিজেরাই দেশের মাটিতে অনিরাপদ। মেঘনা টোলপ্লাজার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যদি সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকারিতা কিংবা পুলিশের নিয়মিত টহল জোরদার থাকত, তবে হয়তো এই ডাকাতি রুখে দেওয়া সম্ভব হতো। পুলিশ বলছে, তারা দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। তবে জনগণের প্রশ্ন—পুলিশের চোখের সামনেই যদি এভাবে ডাকাতি হয়, তবে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নিরাপত্তা পাবে কোথায়? অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারই এখন প্রধান দাবি।
সোনারগাঁ ও কাঁচপুর হাইওয়ে এলাকায় প্রায়ই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর শোনা যায়। তবে চেকপোস্টের সামনে এমন প্রকাশ্য ডাকাতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে যদি ডাকাতদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হয়, তবে রাতের বেলায় যান চলাচল এবং যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। অপরাধীরা সিসিটিভি ফুটেজ এড়াতে অনেক সময় কৌশল পরিবর্তন করলেও, পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি এবং পেট্রোলিং বাড়ালে অপরাধ প্রবণতা অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। আশা করা যাচ্ছে, পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং ভুক্তভোগী প্রবাসী পরিবারটি যেন তাদের প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ বিদেশে ফিরে যেতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে।
পরিশেষে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল চেকপোস্ট বসানোই যথেষ্ট নয়, বরং সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডাকাত দলের প্রতিটি সদস্যকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। প্রবাসী দম্পতির জীবনের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ন্যায়বিচার হোক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো যাত্রী এমন হয়রানি ও ডাকাতির শিকার না হন, সেই প্রত্যাশাই আজ সর্বস্তরের মানুষের।