সর্বশেষ :

জামায়াতের ফেসবুক পেজে পবিত্র কোরআনের আয়াত: নেপথ্যে কি বিশেষ বার্তা?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ১০ বার
জামায়াতের ফেসবুক পেজে পবিত্র কোরআনের আয়াত: নেপথ্যে কি বিশেষ বার্তা?

প্রকাশ: ০৯ জুলাই   ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র কোরআনুল কারিমের শ্বাশত বাণী মানুষের জীবন ও কর্মের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক ফেসবুক পেজে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মুমিনূনের ২ থেকে ৫ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পোস্ট করা হলে তা রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সূরা মুমিনূনের এই চারটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের এমন কিছু বিশেষ গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছেন, যা একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বলয়ে ভারসাম্য নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, তারাই সফল মুমিন যারা নামাজে বিনয়-নম্র, যারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে, যারা নিয়মিত জাকাত দান করে এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে। এই আয়াতগুলো কেবল তিলাওয়াতের বিষয় নয়, বরং বাস্তব জীবনে অনুসরণের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন।

ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরদের মতে, ২ নম্বর আয়াতে নামাজে বিনয়-নম্র থাকার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা কেবল শারীরিক রুকু-সেজদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হৃদয়ের একাগ্রতার নামান্তর। যখন কোনো মুমিন নামাজে দাঁড়ান, তখন তিনি পার্থিব জগতের যাবতীয় চিন্তা, ব্যবসায়িক ব্যস্ততা বা ডিজিটাল জগতের মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে পরম করুণাময়ের সামনে নিজেকে সমর্পণ করেন। মুমিন ব্যক্তি জানেন যে, তিনি খোদ আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই উপলব্ধিবোধই নামাজকে যান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় এবং অন্তরে প্রকৃত প্রশান্তি সঞ্চার করে। এই আয়াতের শিক্ষা বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর অস্থির জীবনে মানুষের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে মানুষ সবসময় কোনো না কোনো উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করে।

৩ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত ‘অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা’ বিষয়টি বর্তমান ডিজিটাল যুগে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্ক, অহেতুক ট্রল, অন্যের পরনিন্দা, কিংবা উদ্দেশ্যহীন আড্ডায় সময় নষ্ট করা মানুষের নৈতিক স্খলনের অন্যতম কারণ। এই আয়াতটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সময়ের মূল্য অপরিসীম। একজন সফল মুমিন কেবল নিজের সময়ের কদরই করেন না, বরং তার মুখ ও লেখনী থেকে যেন কোনো অনর্থক বা ক্ষতিকর কিছু প্রকাশ না পায়, সেদিকেও সজাগ থাকেন। জামায়াতে ইসলামীর পেজে যখন এই আয়াতের ব্যাখ্যাসহ পোস্ট দেওয়া হয়, তখন তা প্রকারান্তরে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল আসক্তির কুফল থেকে দূরে থাকার একটি পরোক্ষ আহ্বান হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।

৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত জাকাত বা অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে এক অনন্য হাতিয়ার। যখন কোনো ব্যক্তি তার অর্জিত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবী মানুষের হাতে তুলে দেয়, তখন তা কেবল তাদের প্রয়োজনই মেটায় না, বরং দাতার হৃদয় থেকে কৃপণতা ও লোভের বিষবাষ্পও নির্মূল করে। ৫ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত লজ্জাস্থানকে সংযত রাখার নির্দেশটি আধুনিক সমাজে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি। যেখানে পর্নোগ্রাফি, অবাধ মেলামেশা এবং অনৈতিক সম্পর্কের সহজলভ্যতা চারিত্রিক অবক্ষয় ডেকে আনছে, সেখানে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের চোখ, মন এবং চরিত্রকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমানার ভেতর আবদ্ধ রাখা। বিবাহিত জীবনের পবিত্রতার মাধ্যমে চরিত্র রক্ষার এই শিক্ষাটি সুস্থ পারিবারিক কাঠামো গঠনের জন্য অপরিহার্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রচারণায় কোরআনের এই ধরনের আয়াত বা নৈতিক বার্তার ব্যবহার নতুন কোনো বিষয় নয়। তাদের পুরো রাজনৈতিক দর্শনই আবর্তিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে। এই আয়াতের পোস্ট কেবল সাধারণ ধর্মীয় বার্তা নয়, বরং এটি তাদের দলীয় পরিচয়েরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন তারা তাদের অফিসিয়াল পেজে এই বার্তাগুলো প্রচার করে, তখন তারা পরোক্ষভাবে নিজেদের সমাজ ও রাজনীতির ময়দানে এমন একটি শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যারা কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত নয়, বরং নৈতিকভাবেও সুশৃঙ্খল। এই ধরনের প্রচারণা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা একটি ভাবমূর্তি তৈরিতে সাহায্য করে, যা ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য।

ধর্মকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে স্পর্শ করা এবং তাদের কাছে পৌঁছানোর কৌশলটি বিশ্বজুড়েই রাজনীতিতে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। যখন কোনো দল সরাসরি রাজনৈতিক আক্রমণ বা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বক্তব্য না দিয়ে নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পোস্ট দেয়, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক কৌতুহল ও সহমর্মিতা তৈরি করে। এটি তাদের দলের প্রতি এক ধরনের ‘সফট কর্নার’ বা কোমল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে কাজ করে। এই পোস্টগুলো সাধারণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিগত নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, সূরা মুমিনূনের এই চারটি আয়াত সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী নিয়ামক হতে পারে। কেবল জামায়াতে ইসলামী নয়, প্রতিটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত এই গুণাবলি। এই ধরনের পোস্টের মাধ্যমে যখন একটি রাজনৈতিক দল কোরআনের চিরন্তন শিক্ষাকে সামনে নিয়ে আসে, তখন তা কেবল দলের প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে সামগ্রিক নৈতিক জাগরণের বার্তাও হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে যারা এই বাণী প্রচার করছেন এবং যারা তা শুনছেন, তাদের নিজেদের জীবনে এই গুণাবলি কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে তার ওপর। ব্যক্তিজীবনের শুদ্ধতা এবং চারিত্রিক পবিত্রতাই পারে একটি সুন্দর রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে সহায়তা করতে, আর সেই লক্ষ্যেই পবিত্র কোরআনের এই শিক্ষাগুলো আজও সমসাময়িক ও প্রাসঙ্গিক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত