প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কেবল সরকারি উদ্যোগে সবুজ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়াবহ অভিঘাত সারা বিশ্ব আজ প্রত্যক্ষ করছে, তা এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং আমাদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে এখন থেকে উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও তার প্রভাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই দিকনির্দেশনা দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ঢাকার বর্তমান অবস্থা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশ্বজুড়ে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার তৃতীয় অবস্থানে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন ও সভ্য রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে বিশ্বমানের এবং স্বাস্থ্যকর বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন যে পরিবেশকে শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়নের ওপর তিনি জোর দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বৃক্ষরোপণ অভিযান কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি টেকসই সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ার সংকল্প। অনুষ্ঠানে তিনি পরিবেশ রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় পরিবেশ পদক ২০২৫, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৬ এবং বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৫ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এছাড়া সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত উপকারভোগীদের মাঝে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন, যা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে গাছ লাগাতে ও বনায়নে উৎসাহিত করার একটি বড় মাধ্যম। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে বনজ সম্পদের সুরক্ষা ও বিস্তার ছাড়া অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষের উচিত ব্যক্তিগত উদ্যোগে অন্তত একটি করে গাছ লাগানো এবং তার পরিচর্যা করা। যখন নাগরিক সমাজ পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব সচেতন হয়ে পালন করবে, তখনই সরকারি উদ্যোগগুলো প্রকৃত সফলতা পাবে। শিল্পকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রেও পরিবেশ আইন কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। যত্রতত্র কারখানা গড়ে তুলে বাতাস ও পানি দূষণ করা চলবে না। বিশেষ করে ঢাকা শহরের চারপাশে যে নদীগুলো রয়েছে, সেগুলোর দূষণ রোধে এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ঢাকাকে ঘিরে থাকা সবুজ বলয় পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তদারকির নির্দেশ দেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিবেশবিদ এবং বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযোজন ও প্রশমন—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সাফল্য সারা বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে আমাদের নগরায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, কংক্রিটের শহর বানিয়ে আমরা নগরবাসীকে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারি না। বরং প্রতিটি দালানের ছাদে বা বারান্দায় সবুজায়ন নিশ্চিত করতে পারলে তা ঢাকার তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
বৃক্ষরোপণ মেলা ও অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মাঝে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ফলজ ও বনজ গাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই মেলার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা বৃক্ষরোপণে অনুপ্রাণিত হবেন এবং একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সফল হবে। তিনি বলেন, আমাদের সন্তানদের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে এখন থেকেই গাছের যত্ন নিতে হবে। যারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশের উন্নয়নে কাজ করছেন, তাদের নিরলস পরিশ্রমকে তিনি সাধুবাদ জানান। পুরস্কারপ্রাপ্তদের এই সম্মাননা কেবল তাদের কাজের স্বীকৃতি নয়, বরং এটি অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকাকে বসবাসযোগ্য আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এই কাজ সহজ নয়, তবে আমরা যদি পরিকল্পনামাফিক এগোতে পারি এবং প্রতিটি নাগরিক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন, তবে ঢাকা তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে। পরিবেশ রক্ষা মানে কেবল গাছ লাগানো নয়, বরং অপচয় রোধ, দূষণ কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা উপহার দিতে সরকারের প্রতিটি দপ্তরের সাথে নাগরিক সমাজের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। এই বৃক্ষরোপণ অভিযান সেই লক্ষ্যের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে গণ্য হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।