সর্বশেষ :

সরকারি অনুদান কর্মকর্তার পকেটে: ডেইরি প্রকল্পে কোটি টাকার লুটপাট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ বার
সরকারি অনুদান কর্মকর্তার পকেটে: ডেইরি প্রকল্পে কোটি টাকার লুটপাট

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধজাত খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছিল ‘দ্য লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ বা এলডিডিপি। দেশের ৬১টি জেলায় বিস্তৃত এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক খামারিদের ভাগ্যের উন্নয়ন এবং পুষ্টির জোগান দেওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মহৎ উদ্দেশ্যে নেওয়া এই প্রকল্পই এখন দুর্নীতি ও হরিলুটের এক বিশাল আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই প্রকল্পের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে সরকারের প্রায় ৬৭ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি পাওয়া গেছে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

দুর্নীতির এই মহোৎসবের সবচেয়ে আলোচিত ও ঘৃণ্য উদাহরণটি পাওয়া গেছে গাজীপুরের কালীগঞ্জে। প্রকল্পের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ডা. মো. ইউসুফ হাবিব তাঁর নিজ স্ত্রীর নামে ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ নামক একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে হাতিয়ে নিয়েছেন ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। প্রজেক্টের নীতিমালা অনুযায়ী, এই অর্থ পাওয়ার কথা ছিল প্রকৃত খামারিদের, যারা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী। অথচ সিএজি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্বই নেই। ডা. ইউসুফ হাবিব নিজের পদমর্যাদার অপব্যবহার করে নথিপত্রে কারচুপি করেছেন এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ভুক্তভোগী স্ত্রী কান্তা সমকালের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে এবং ওই টাকা তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হলেও পরে ইউসুফ হাবিব তা নিজের ব্যক্তিগত হিসাবে সরিয়ে নেন। ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সরকারি অনুদান আত্মসাতের এই ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম নিদর্শন।

কেবল গাজীপুর নয়, দুর্নীতির এই বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটেও। ‘মেসার্স কেসি এগ্রো’ নামক এক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই। সরেজমিনে দেখা গেছে, কাগজপত্রে ফ্রিজার ভ্যান ও দই তৈরির মেশিনের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোনো যন্ত্রপাতির অস্তিত্বই নেই। একইভাবে টাঙ্গাইলের সখীপুরে ‘মেসার্স মিনিস্টার ফিডস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে কেবল একটি গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রকল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এভাবে অযোগ্য ও ভূয়া প্রতিষ্ঠানকে সরকারি অর্থ দেওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেট জড়িত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রকল্পটির আর্থিক দুর্নীতির আরেকটি বড় চিত্র ফুটে উঠেছে গাড়ি কেনায়। সরকারি অর্থ কীভাবে অপচয় করা হয়েছে তার নজির হয়ে আছে ১১৫টি ডাবল কেবিন পিকআপ। অর্থ বিভাগের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী প্রতিটি গাড়ির মূল্য সর্বোচ্চ ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রতিটি গাড়ি কেনা হয়েছে ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি গাড়িতে প্রায় ৩০ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। এভাবে কেবল ১১৫টি গাড়ি কিনতেই সরকারের গচ্চা দিতে হয়েছে ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকারও বেশি। এর পেছনে কোনো বড় ধরনের কারসাজি বা কমিশন বাণিজ্য না থাকলে এত বিশাল অঙ্কের ব্যবধান হওয়া প্রায় অসম্ভব।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬ হাজার ৩২০টি পানি পাম্প কেনা হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশ কোনো কাজেই আসছে না। অর্ধেক হর্সপাওয়ারের এই পাম্পগুলো ভূগর্ভস্থ পানি তোলার মতো শক্তিশালী নয়। ফলে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জামগুলো এখন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের অর্থের চরম অবমাননা ছাড়া আর কিছুই নয়। এছাড়াও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চ দরে জেনটেক্স-সেমেক্স জেভিকে কাজ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি ক্রয় বিধিমালার চূড়ান্ত লঙ্ঘন।

এই পরিস্থিতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, এই অডিট প্রতিবেদন প্রমাণ করে উন্নয়নের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির মহোৎসব কতটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটি কেবল একটি প্রকল্পের অনিয়ম নয়, বরং সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর ভঙ্গুরতার চিত্র। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির হিসাব কেবল অডিট প্রতিবেদনের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গভীর ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।

প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল অডিট রিপোর্টের জবাবে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, প্রতিবেদনটি এখনও তাদের হাতে পৌঁছায়নি। প্রশাসনিক স্তরে এই যে কালক্ষেপণ এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতি, তা দুর্নীতিবাজদের আরও সাহস জোগাচ্ছে। দেশের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়নের নামে যখন পকেট ভারী করার উৎসব চলে, তখন প্রবৃদ্ধি ও টেকসই কৃষি খাতের স্বপ্ন সুদূরপরাহত হয়ে পড়ে। একটি প্রকল্পের অর্থ যখন খামারিদের হাতে না পৌঁছে কর্মকর্তাদের বিলাসিতার উপকরণের জোগান দেয়, তখন সেই প্রজেক্টের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

পরিশেষে বলা যায়, ‘দ্য লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর এই দুর্নীতি একটি জ্বলন্ত সতর্কবার্তা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে জনগণের অর্থ লুট করা হয়, তা এই প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে দৃশ্যমান। সরকার যদি এখনই শক্ত হাতে এসব অনিয়মের রাশ টেনে ধরতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে সরকারি বড় প্রকল্পগুলো দুর্নীতির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়েই থাকবে। অনতিবিলম্বে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সম্পদ ও বেতন-ভাতা থেকে এই অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণ আশা করে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী কেবল দোষীদের চিহ্নিত করাই নয়, বরং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থায় পুনরায় ফিরিয়ে আনা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত