প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম চূড়ান্ত করা হবে। এমন কোনো শর্ত সরকার গ্রহণ করবে না, যা দেশের অর্থনীতি বা সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী।
রোববার (১২ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি বলেন, সরকার আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে দেখলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য ঋণ সংগ্রহ নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাঁর ভাষায়, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে বড় বিষয়। তাই যে কোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বা কর্মসূচি গ্রহণের আগে বাংলাদেশের বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফের সঙ্গে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল, তাতে এমন কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল যা জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাঁর মতে, সেই কর্মসূচির কিছু শর্ত বাস্তবায়ন করলে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারত এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারণেই বর্তমান সরকার সেই কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে এবং নতুনভাবে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন যে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে, সেখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এমন একটি কাঠামো তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সরকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সর্বাগ্রে থাকবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের বিদ্যমান ভিসা নীতি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমান ভিসা ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত এবং আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে বিদেশি নাগরিক, পর্যটক এবং বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে সহজে আসতে পারেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভিসা নীতির আধুনিকায়নের ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, বরং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
এদিকে একই অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রবীণ আইনজীবী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদ। দেশের আইন, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচি এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব সংস্কারের ঘোষণা আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত কর্মসূচির শর্ত, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হওয়ার পরই এর কার্যকারিতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।