প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও মূল্যবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পর শনিবার (১১ জুলাই) থেকে নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ও রুপা। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর দামের ওঠানামা, স্থানীয় বাজারে পিওর গোল্ড ও পিওর সিলভারের মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
বাজুসের ঘোষণায় বলা হয়েছে, গত ১০ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি হচ্ছে সংশোধিত দামে। নতুন এই সমন্বয়ে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ২ হাজার ২১৬ টাকা এবং প্রতি ভরি রুপার দাম ১১৭ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অলঙ্কার কিনতে আগ্রহী সাধারণ ক্রেতাদের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমান মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। ২১ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৩ টাকায়। ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৩ টাকা। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম রাখা হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩২ টাকা।
বাজুস জানিয়েছে, অলঙ্কারের নকশা, কারিগরি কাজ এবং নির্মাণ ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত মজুরি যুক্ত হতে পারে। তবে স্বর্ণালঙ্কার ও রৌপ্য অলঙ্কারের বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না। একই সঙ্গে অলঙ্কার এক্সচেঞ্জ কিংবা পুরোনো অলঙ্কার ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট, মজুরি এবং ব্যবহৃত পাথরের মূল্য বাদ দিয়ে আগের নিয়মই বহাল থাকবে।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট রুপার প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৭২৪ টাকায়। ২১ ক্যারেট রুপার দাম ৪ হাজার ৫৪৯ টাকা, ১৮ ক্যারেট রুপার দাম ৩ হাজার ৯০৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯১৬ টাকায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর দামের পরিবর্তন, ডলারের বিনিময় হার এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচামালের দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের স্বর্ণ ও রুপার বাজারে প্রভাব ফেলে। এ কারণে সময়ে সময়েই বাজুস বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নতুন দর নির্ধারণ করে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন স্বর্ণের দাম বাড়ে কিংবা স্থানীয়ভাবে পিওর গোল্ডের সংগ্রহমূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
চলতি বছর দেশের স্বর্ণবাজারে দামের ব্যাপক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মোট ৮৯ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ বার দাম বেড়েছে, ৪৪ বার কমেছে এবং একবার ভ্যাট সংক্রান্ত সমন্বয় করা হয়েছে। ঘন ঘন এই মূল্য পরিবর্তন দেশের স্বর্ণবাজারকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গতিশীল করে তুলেছে।
এর ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ৯ জুলাই, প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমানো হয়েছিল। তখন ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। তবে মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে আবারও দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাজুস। এতে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত বছরের পরিসংখ্যানও একই ধরনের প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬৪ বার দাম বৃদ্ধি এবং ২৯ বার দাম হ্রাস করা হয়। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরেই দেশের স্বর্ণবাজারে মূল্য পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।
রুপার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৫৫ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ বার দাম বেড়েছে এবং ২৭ বার কমেছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে মোট ১৩ বার রুপার দাম পরিবর্তন করা হয়েছিল। সেবার ১০ বার দাম বাড়ানো হয় এবং মাত্র তিনবার কমানো হয়েছিল।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিয়ের মৌসুম, উৎসব এবং বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে স্বর্ণের বাজারে লেনদেনও বৃদ্ধি পায়। তবে ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের কারণে অনেক ক্রেতা কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতে অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ কেউ ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় বর্তমান দামেই স্বর্ণ কিনে রাখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ কেবল অলঙ্কার নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে থাকেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়লে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ে।
বর্তমানে যারা স্বর্ণ বা রুপা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের কেনাকাটার আগে সর্বশেষ মূল্য যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বাজুস যেকোনো সময় আবারও নতুন মূল্য ঘোষণা করতে পারে। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের জন্যই সর্বশেষ মূল্যতালিকা সম্পর্কে অবগত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।