প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষের হামলা ও সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি। এতে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার দিকে মোড় নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইফ এলাকায় হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোন হামলার ঘটনায় সৌদি আরবে বসবাসকারী এক ইয়েমেনি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন। হুতিদের হামলা জোরদার হওয়ার পর চলতি মাসে সৌদি আরবে কোনো প্রাণহানির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার মধ্যে এটিই প্রথম বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের খবরে সৌদি আরবের বিমান হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। হুতিদের দাবি, তাইজ প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান তিনটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইয়েমেনের আবস এলাকায় আরেকটি হামলায় একজন আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এরপর হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমগুলোতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে এবং আরও কয়েকজন ইয়েমেনি নাগরিক আহত হয়েছেন। হুতিদের পক্ষ থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারপন্থী বাহিনীকে ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সংঘাতের দুই পক্ষের দেওয়া এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তাইফে হামলার ঘটনায় কুয়েত ও বাহরাইন সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। দুই দেশই হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও হুতিদের সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
সংঘাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকগুলোর একটি হলো মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর সৌদি অভিযোগ। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, হুতিরা মক্কার দিকে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল এবং সেটি প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে। ইসলামের অন্যতম পবিত্র নগরী মক্কাকে ঘিরে এমন অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ায় ঘটনাটি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
তবে হুতিদের নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি সৌদি আরবের এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি সৌদি দাবিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হুতিরা কখনো মক্কার মতো পবিত্র শহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য পূরণে সৌদি আরব মিথ্যা তথ্যকে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
আল-হুতি আরও দাবি করেন, ইয়েমেনের সর্বশেষ সংঘাত সৌদি আরবের পক্ষ থেকেই শুরু হয়েছে এবং হুতিরা আত্মরক্ষার অবস্থান থেকে লড়াই করছে। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতা এবং মক্কাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি দাবি করেছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হুতিদের বাহিনী বড় ধরনের সামরিক চাপের মুখে রয়েছে। তাইজ, মারিব, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, আল-বায়দা ও আল-দালে অঞ্চলে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। সৌদি-সমর্থিত পক্ষের দাবি, লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি স্থায়ী নয়।
এদিকে মক্কার দিকে ড্রোন হামলার অভিযোগ নিয়ে ইরানও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন নিন্দনীয়। তবে মক্কার দিকে যাওয়ার পথে একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে—এমন একটি দাবির ভিত্তিতেই হুতিদের ওই হামলার জন্য দায়ী করা যথেষ্ট নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
ইরানি মুখপাত্র আরও সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ধরনের ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অভিযানের অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে সৌদি আরবের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ড্রোন হামলাটি কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের বর্ণনায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় থাকা পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হলে ওই দুই দেশের ওপরও কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থান স্পষ্ট করার চাপ বাড়তে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ বাস্তবায়নের সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগও পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে তিনি ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর ফলে সৌদি আরব, ইয়েমেন, ইরান ও পাকিস্তানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার পরিধিও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা। সৌদি আরবের তাইফ এলাকায় এক ইয়েমেনি নাগরিকের মৃত্যু এবং ইয়েমেনে শিশুদের নিহত হওয়ার অভিযোগ সংঘাতের মানবিক মূল্যকে সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য নতুন করে সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
ইয়েমেনের সংঘাত বহু বছর ধরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত। সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে, আর হুতিরা দেশের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ইয়েমেনের সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ, সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা, ইয়েমেনে পাল্টা বিমান হামলা এবং বেসামরিক হতাহতের খবর—সব মিলিয়ে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে আত্মরক্ষামূলক হিসেবে তুলে ধরছে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করছে। কিন্তু এসব দাবির অনেকগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় সংঘাতের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন।
আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা এখন পরিস্থিতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে মিত্রদের নিরাপত্তা সহযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। চীনও প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বেসামরিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ বাড়তে থাকলে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা সীমিত পর্যায়ে থাকবে, নাকি এটি ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেবে। পরিস্থিতির পরবর্তী developments এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।