প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিদেশ যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরও শেষ মুহূর্তে আটকে যাচ্ছে হাজার হাজার বাংলাদেশির যাত্রা। কারও ভিসা বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্রে অসংগতি, কারও কাগজপত্র জাল, আবার কারও ইমিগ্রেশনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নথিপত্রের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচারের আশঙ্কা কিংবা সীমিত ও বন্ধ শ্রমবাজারে বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টাও অনেক ক্ষেত্রে বিদেশযাত্রা বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে ৮১ হাজার ৫০০ যাত্রীর বিদেশযাত্রা বাতিল করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের ভিসায় দুই কোটি ৯১ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়ম মেনে বিদেশে যেতে পারলেও একটি বড় অংশকে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশ গেছেন ২৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ বাংলাদেশি। এই সময়ে বিভিন্ন কারণে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৭ হাজার ৮১৯ জনকে। ২০২৫ সালে বিদেশে গেছেন ৫৭ লাখ ৮ হাজার ১৩২ জন। ওই বছর আটকে দেওয়া হয় ১৫ হাজার ৫১৬ জনের যাত্রা। ২০২৪ সালে ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৩ জন বিদেশ গেলেও বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় ১৮ হাজার ৯ জনকে।
এর আগের বছর ২০২৩ সালে ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩ জন বাংলাদেশি বিদেশে যাওয়ার বিপরীতে ৯ হাজার ৮৭২ জনের যাত্রা আটকে দেওয়া হয়। ২০২২ সালে ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৩ জন বিদেশ যান এবং ফেরত পাঠানো হয় ১৮ হাজার ৭৫৬ জনকে। আর ২০২১ সালে ২০ লাখ ৬০ হাজার ৬৮৩ জন বিদেশ যাওয়ার বিপরীতে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় ১১ হাজার ৫২৮ জনকে।
এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে নানা ধরনের ঘটনা। সম্প্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওমানগামী এক নারীকে আটকে দেওয়ার ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ। স্বামীর কাছে যাওয়ার কথা বলে ওই নারী বিএমইটির ছাড়পত্রও নিয়েছিলেন। কিন্তু ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়ে।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ওমানে থাকা স্বামীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। কিন্তু বিয়ের বৈধ নথি দেখাতে না পারায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরে তিনি যে বিয়ের ছবি দেখান, সেটিও যাচাই করে জাল বলে সন্দেহ করা হয়। আরও যাচাইয়ে ডিজিটাল রেকর্ডে দেখা যায়, একই স্পাউস ভিসার অনুমোদনপত্র ব্যবহার করে ভিন্ন সময়ে আলাদা পাসপোর্টে পাঁচ নারীকে ওমানে পাঠানোর তথ্য রয়েছে। এরপর ওই নারীর বিদেশযাত্রা বাতিল করা হয়।
ইমিগ্রেশন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখন শুধু কাগজপত্র দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। ভিসা, পাসপোর্ট, ছাড়পত্রের পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্য, আগের ভ্রমণ ইতিহাস এবং ইমিগ্রেশনে দেওয়া বক্তব্যও যাচাই করা হচ্ছে। এর ফলে একই নথি ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তিকে বিদেশ পাঠানোর মতো জালিয়াতিও শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে অন্তত ২৩টি দেশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে বলে ইমিগ্রেশন পুলিশের সূত্র জানিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ রয়েছে। জাল নথি ব্যবহার করে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা যেমন ধরা পড়ছে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমিত বা বন্ধ শ্রমবাজারে বিকল্প রুটে প্রবেশের পরিকল্পনাও শনাক্ত হচ্ছে।
ইতালির পারিবারিক ভিসাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ জালিয়াতির তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘পেজ সাবস্টিটিউশন’ পদ্ধতিতে প্রকৃত ভিসাগ্রহীতার পাসপোর্ট থেকে ভিসার পৃষ্ঠা, বাংলাদেশের বহির্গমন সিল এবং ইতালির প্রবেশ সিল নকল করে অন্য ব্যক্তির পাসপোর্টে বসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। বাইরে থেকে নথি বৈধ বলে মনে হলেও বিস্তারিত যাচাইয়ের পর এর অসংগতি ধরা পড়ছে।
একইভাবে জাল পাসপোর্ট শনাক্তের ঘটনাও ঘটছে বিমানবন্দরে। দীর্ঘদিন ফ্রান্সে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি দেশে ফেরার সময় প্রায় ১০ হাজার ইউরো খরচ করে তৈরি করা একটি ভুয়া সুইস পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। পাসপোর্টের আকার ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে অসংগতি থাকার পর স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে এর বায়োমেট্রিক চিপের সংকেত না পাওয়ায় জালিয়াতির বিষয়টি শনাক্ত হয়।
বাংলাদেশিদের একটি অংশ আবার দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অনিয়মিত অভিবাসনপথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পুলিশের একজন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের কিছু তরুণ ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের যাত্রায় জনপ্রতি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে এসব রুটে যাত্রীদের নথিপত্র ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে আলাদা নজরদারি করা হচ্ছে।
তবে বিমানবন্দরে আটকে পড়া প্রত্যেক যাত্রী যে জালিয়াতি বা অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত, এমনটি নয়। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা যাচাইয়ের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে কিছু যাত্রীর। এক শিক্ষার্থী জানান, প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় তাকে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়।
আরেক যাত্রী জানান, বৈধ ভিসা ও বিএমইটি ছাড়পত্র থাকার পরও তাকে মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে উঠতে দেওয়া হয়নি। পরে ইমিগ্রেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তিনি বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পান। এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিদেশগামী যাত্রীদের মধ্যে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ বলেন, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার ঠেকাতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। যাত্রীদের আচরণ, বক্তব্য ও তথ্য যাচাই করে সন্দেহজনক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে টাকা দিয়ে পার পাওয়া বা অন্যায্যভাবে যাত্রী আটকে দেওয়ার কিছু অভিযোগ সত্য বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, শুধু দালাল বা জালিয়াতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। বিদেশগামী কর্মীদের নথিপত্র যাচাই ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিএমইটি এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর লেবার উইংয়ের যাচাইপ্রক্রিয়ায় আরও নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, বিএমইটির ভিসা যাচাইয়ের সক্ষমতা এখনও সীমিত। কিছু অসাধু কর্মকর্তা নকল নথিপত্রে ছাড়পত্র দেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্যও তার নজরে এসেছে। সার্বিয়ায় ভুয়া ভিসায় বিএমইটি ছাড়পত্র দেওয়ার একটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি জানান, সার্বিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লিবিয়ার মতো তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা যাচাই আরও কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএমইটিতে পূর্ণাঙ্গ ভিসা যাচাই ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি ইমিগ্রেশনের একটি দল সেখানে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের শেষ ধাপটি একজন কর্মী বা শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পর্যায়ে এসে যাত্রা বাতিল হলে শুধু বিমানের টিকিট বা ভিসার খরচই নষ্ট হয় না, অনেকের ক্ষেত্রে নিয়োগ, চাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি কিংবা পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়ে। বিশেষ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা শ্রমিকদের জন্য বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে জালিয়াতি, মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে বিমানবন্দরে কঠোর যাচাইও প্রয়োজন। ফলে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা ও যাত্রী অধিকার—দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। সন্দেহজনক নথি ও ভ্রমণ পরিকল্পনা যাচাইয়ের পাশাপাশি বৈধ কাগজপত্র থাকা যাত্রী যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশগামী যাত্রীর নথিপত্র তৈরির শুরু থেকে বিমানবন্দরে চূড়ান্ত যাচাই পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। কারণ বিমানবন্দরে জাল নথি শনাক্ত হওয়া যেমন অনিয়ম ঠেকানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তেমনি বৈধ যাত্রীর অযথা আটকে যাওয়া ঠেকানোও প্রশাসনিক দক্ষতার অংশ। বিদেশে কর্মসংস্থানের বিশাল বাজারের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এই দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।