মৌলভীবাজার সদরে বিএনপির প্রার্থী ঘিরে তৎপরতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
মৌলভীবাজার সদরে বিএনপির প্রার্থী ঘিরে তৎপরতা

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাধিক অংশ মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ, মতবিনিময় ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। এতে একই দলের একাধিক নেতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি দলীয় সিদ্ধান্তের পর সবাইকে এক প্রার্থীর পক্ষে একত্রিত করা নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটিতেই বিএনপির দুই থেকে পাঁচজন করে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। সব মিলিয়ে অর্ধশতাধিক নেতা চেয়ারম্যান পদে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তপশিল ও আনুষ্ঠানিক প্রার্থী বাছাইয়ের আগেই এই তৎপরতা শুরু হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে প্রতিযোগিতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

দলীয় সমর্থন না পাওয়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন—এমন আলোচনা স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিএনপির জেলা নেতৃত্ব বলছে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি দলীয়ভাবে বিবেচনা করা হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী বাছাই এবং দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দলের মূল কমিটি, সহযোগী সংগঠন, সাবেক জনপ্রতিনিধি এবং প্রবাসী নেতাদের অনেকে। খলিলপুর ইউনিয়নে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ জুয়েল আহমদ এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাবেক ছাত্রদল নেতা আবু সালেহের নাম আলোচনায় রয়েছে।

মনুমুখ ইউনিয়নে বিএনপির সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক সেফুল, জেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা আব্দুল হেকিম, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপি নেতা মর্তুজা মিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা শাহ মশাহিদ মিয়ার নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে।

আখাইলকুঁড়া ইউনিয়নে জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ও সাবেক চেয়ারম্যান শামীম আহমদ, সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম এবং যুবদলের সাবেক নেতা রুমেল আহমদকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে। কামালপুর ইউনিয়নে একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফয়সল আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বেলাল মিয়ার নাম রয়েছে।

কনকপুর ইউনিয়নেও একাধিক নেতা নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়ে সক্রিয় রয়েছেন। তাদের মধ্যে জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফুয়াদ জামান, জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহমদ মাহফুজুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কাজল মাহমুদ এবং যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতা শাহীন আহমেদের নাম আলোচনায় রয়েছে।

আমতৈল ইউনিয়নে সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান রানা খান শাহীন, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এম এ মোহিত এবং সদর উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমির মাহমুদের নাম শোনা যাচ্ছে। কাগাবলা ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ, আইনজীবী আব্দুস সালাম এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ডি এম মুক্তাদীর রাজু সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়ে সক্রিয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

নাজিরাবাদ ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আশরাফ উদ্দিন আহমদ, জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান এনামুল হক রাজা এবং জুয়েল আহমদের নাম রয়েছে। গিয়াসনগর ইউনিয়নে বিএনপির সভাপতি আতাউর রহমান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা সৈয়দ ময়নুল হক, বিএনপি নেতা রোমান আহমদ রাণু এবং জিলা মিয়া মেম্বারের নাম আলোচনায় এসেছে।

চাঁদনীঘাট ইউনিয়নে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মতিন বক্স, সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সাদিকুর রহমান, জেলা যুবদলের সদস্য নাজমুল মামুন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব মামনুন চৌধুরী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

মোস্তফাপুর ইউনিয়নে সদর উপজেলা বিএনপির সদস্য তোফায়েল আহমদ তুয়েল, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান হোসেন এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা সৈয়দ তানভীর আহমদের নাম রয়েছে। একাটুনা ইউনিয়নে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক সহসম্পাদক মোহিতুর রহমান হেলাল এবং ইউপি বিএনপির সভাপতি ছালিকুর রহমান প্রার্থিতার বিষয়ে সরব রয়েছেন।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততাকে দলীয় বিবেচনায় গুরুত্ব দেওয়ার দাবি করছেন। একাটুনা ইউনিয়নের সম্ভাব্য প্রার্থী মোহিতুর রহমান হেলাল জানিয়েছেন, আশির দশকের শেষ দিকে ছাত্রদলের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন এবং অতীতে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। তার প্রত্যাশা, দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় নেওয়া হবে।

নাজিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন আহমদও নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও স্থানীয় সমর্থনের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিকূল সময়েও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং জনগণের সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্তে নিজের অবস্থান বিবেচিত হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন বলেছেন, দলের কঠিন সময়ে যারা তৃণমূলে সক্রিয় ছিলেন এবং যাদের স্থানীয় জনসমর্থন রয়েছে, তাদের মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ত্যাগের পাশাপাশি জনপ্রিয়তার বিষয়টিও দলীয় বিবেচনায় থাকতে পারে।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আইনজীবী ফয়জুল করিম ময়ূন জানিয়েছেন, তপশিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামলানো কিছুটা কঠিন হতে পারে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ গেলে হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর আগে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নজিরও রয়েছে। ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনেও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে বিএনপির দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও সদর উপজেলার ১২ ইউনিয়নের ফলাফলে বিভিন্ন দলের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। ওই নির্বাচনে কয়েকটি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীর বাইরে থাকা প্রার্থীরাও জয় পান। ফলে এবারও দলীয় সিদ্ধান্তের পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান কী হয়, সেটি স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও কয়েকটি ইউনিয়নে গণসংযোগ চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ফলে নির্বাচন সামনে রেখে শুধু একই দলের ভেতরের প্রতিযোগিতা নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

তবে এখন পর্যন্ত আলোচনায় থাকা নামগুলোকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দলীয় সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী তপশিল, মনোনয়নপ্রক্রিয়া এবং প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পরই ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্তের পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের কতজন তা মেনে নিয়ে একক প্রার্থীর পক্ষে মাঠে থাকেন, সেটিও নির্বাচনী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে বিএনপির একাধিক নেতার প্রার্থিতার আগ্রহ এখন স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দলীয় নেতৃত্বের সামনে একদিকে তৃণমূলের বিভিন্ন পক্ষের প্রত্যাশা বিবেচনা করার বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে প্রার্থী বাছাইয়ের পর সংগঠনের ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে নির্বাচনের আগে বিএনপির স্থানীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতির পরবর্তী চিত্র।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত