জাতিসংঘে নতুন বাংলাদেশের বার্তা দেবেন তারেক রহমান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
জাতিসংঘে নতুন বাংলাদেশের বার্তা দেবেন তারেক রহমান

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর এই ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন, জলবায়ু সংকট, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ভাবনা তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণকে ঘিরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরতে চায়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় ২১ সেপ্টেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেবেন। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত নৈশভোজেও তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। অধিবেশনের মূল কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংস্কার কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি রূপরেখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে একটি পরিবর্তনশীল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অন্যতম রোহিঙ্গা সংকটও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এই সংকটের স্থায়ী ও নিরাপদ সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর দায়িত্বের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছে। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার প্রস্তুতি রয়েছে।

বিশেষ করে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের ওপর জোর দিতে পারে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে বেশি দায়ী, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যে আর্থিক ও মানবিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, সেই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে চায় সরকার।

পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ, দেশজুড়ে খাল খনন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপগুলো পরিবেশ ও জলবায়ু নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য স্বাস্থ্য খাতও এবারের সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে যাচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সুইডেন ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানো এবং মিডওয়াইফারি সেবার বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সরকারের ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ উদ্যোগের বিভিন্ন দিকও সেখানে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থার পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আহ্বান জানাবে বাংলাদেশ।

মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফের পদ সৃষ্টির অঙ্গীকারও আলোচনায় আসতে পারে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জাতিসংঘের ওই বিশেষ মন্ত্রীপর্যায়ের সংলাপে মেক্সিকো, নেপাল, সিয়েরা লিওন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক দাতা প্রতিষ্ঠান, জনহিতৈষী সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। ফলে স্বাস্থ্যসেবার একটি আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের কাঠামো তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতিও গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে। নতুন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব নীতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে। শিল্প, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য নিজেদের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এবারের অধিবেশন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও বৈদেশিক নীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে।

বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলো বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ ও পরিবেশের মতো বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও সফরসূচিতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের অগ্রাধিকারই প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সফর শেষে বাংলাদেশ সময় ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এর আগে নিউইয়র্কে বিভিন্ন বৈঠক ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে।

সব মিলিয়ে জাতিসংঘের এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরার একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের রূপরেখা, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জলবায়ু অর্থায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিদেশি বিনিয়োগ—এসব বিষয়কে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সফরকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত