কুষ্টিয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তারে ঝুলছিল মিস্ত্রির লাশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
কুষ্টিয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তারে ঝুলছিল মিস্ত্রির লাশ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি তিনতলা ভবনের বাইরের অংশে টাইলস বসানোর কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. সাজিদ (২৪) নামের এক টাইলস মিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে। কাজ করার সময় তিনি ১১ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে আসেন বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা তারের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল তার মরদেহ। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।

শুক্রবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের ষোলদাগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। নিহত সাজিদ পূর্ব চর দামুকদিয়া এলাকার বাসিন্দা।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, সাজিদ ওই এলাকার বাসিন্দা সুজন উদ্দিনের তিনতলা বাড়ির বারান্দা ও বাইরের অংশে টাইলস বসানোর কাজ করছিলেন। ঘটনার আগে টানা তিন দিন ধরে তিনি সেখানে কাজ করছিলেন। ভবনটির বারান্দার কাছ দিয়েই ১১ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক লাইন চলে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনের বারান্দা থেকে বৈদ্যুতিক খুঁটির তারের দূরত্ব ছিল আনুমানিক সাড়ে তিন ফুট।

এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সাজিদ বাঁশের তৈরি মাচার ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। মাচায় অবস্থান করার সময় উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক তার থেকে তার দূরত্ব আরও কমে প্রায় দেড় ফুট ছিল বলে তাদের দাবি। এ অবস্থায় কোনো ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শুক্রবার বিকেলে কাজ করার একপর্যায়ে সাজিদ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। বিদ্যুতের তারের সঙ্গে আটকে যাওয়ার পর তিনি সেখানেই ঝুলে থাকেন। উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক লাইন চালু থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি। প্রায় এক ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।

ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও শোকের সৃষ্টি হয়। কর্মরত অবস্থায় একজন শ্রমিকের এমন মৃত্যু শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, আশপাশের মানুষের কাছেও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৈদ্যুতিক লাইনের খুব কাছাকাছি ভবনের কাজ চলছিল এবং মাচার ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করায় ঝুঁকির মাত্রা ছিল বেশি।

সাজিদের চাচা আবদুল আজিজ জানান, তার ভাতিজা ওই বাড়িতে তিন দিন ধরে টাইলস বসানোর কাজ করছিলেন। এত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় তাকে কাজ করতে দেওয়া উচিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছে সাজিদের আকস্মিক মৃত্যু বড় ধরনের শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিশেষ করে নির্মাণকাজ, টাইলস বসানো, রং করা, ধাতব কাঠামো স্থাপন বা ভবনের বাইরের অংশে কাজ করার সময় বৈদ্যুতিক লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। উচ্চক্ষমতার লাইনের ক্ষেত্রে সরাসরি তার স্পর্শ না হলেও কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এ ধরনের কাজের আগে বিদ্যুৎলাইন, কাজের উচ্চতা ও নিরাপদ দূরত্ব সম্পর্কে সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ভেড়ামারা আবাসিক প্রকৌশলী মাসুম পারভেজ বলেন, বৈদ্যুতিক লাইন নির্ধারিত ম্যাপ অনুযায়ী স্থাপন করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত জায়গা না রেখে বৈদ্যুতিক লাইনের এত কাছাকাছি ভবন নির্মাণ করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ১১ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক তারের আশপাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া কোনো ধরনের কাজ না করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎলাইনের অবস্থান বিবেচনার বিষয়টি সামনে এসেছে। কোনো ভবনের বারান্দা, ছাদ বা বাইরের অংশে কাজ করার সময় আশপাশের বৈদ্যুতিক তারের দূরত্ব পর্যাপ্ত কি না, তা আগে থেকেই যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাঁশের মাচা বা অন্য কোনো উঁচু কাঠামো ব্যবহার করলে শ্রমিকের সঙ্গে বিদ্যুৎলাইনের দূরত্ব আরও কমে যেতে পারে।

ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনমাস্টার শফিকুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন। উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎলাইনের কারণে উদ্ধারকাজে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে।

ঘটনার পর বাড়ির মালিক সুজন উদ্দিনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। ফলে টাইলস বসানোর কাজের সময় কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, শ্রমিককে কাজের আগে কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বিদ্যুৎলাইনের ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা অবগত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভেড়ামারা থানার উপপরিদর্শক মাইদুল ইসলাম জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে। ফায়ার সার্ভিস মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আইনগত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এ ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। একজন শ্রমিককে কোনো নির্মাণ বা সংস্কারকাজে নিয়োজিত করার আগে কর্মস্থলের সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা, বৈদ্যুতিক লাইনের নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা জরুরি। উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎলাইনের আশপাশে কাজের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করাও দুর্ঘটনা এড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সাজিদের মৃত্যু তার পরিবারের জীবনে আকস্মিক শূন্যতা তৈরি করেছে। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের মতো কাজ করতে গিয়ে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তার প্রাণ হারানোর ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি করেছে—নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল কি না।

এখন পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে নিহতের পরিবার। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, কাজের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে নির্মাণ ও সংস্কারকাজে বিদ্যুৎনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একটি প্রাণহানি কখনোই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিও একটি পরিবারের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভেড়ামারার এই ঘটনা তাই নির্মাণশ্রমিক ও মিস্ত্রিদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত