ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় হোয়াইট হাউসে তিন সংবাদমাধ্যম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় হোয়াইট হাউসে তিন সংবাদমাধ্যম

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সংবাদমাধ্যম তিনটির বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশের অভিযোগ তোলেন এবং জানান, সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রেসের প্রবেশাধিকার এবং সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও সংবাদমাধ্যমের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হোয়াইট হাউসের মতো সরকারি স্থানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হলে তা সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তবে ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে এবং এর পরিধি কতটা বিস্তৃত হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প শুক্রবারের পোস্টে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করার কথা জানান। তার অভিযোগ, এসব সংবাদমাধ্যম প্রেসিডেন্ট, তার প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নিয়মিত ‘মিথ্যা’ বা মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের সংবাদমাধ্যমকে আরও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও ট্রাম্প তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমকে সরকারের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ন্যায্য ও সৎ থাকা উচিত। নির্দিষ্ট কোনো একটি প্রতিবেদনের পরিবর্তে গত কয়েক বছরে ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবেদন ও কভারেজ তার সিদ্ধান্তের কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাম্প আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ করেছেন। তার কাছে জানতে চাওয়া হলে ভবিষ্যতে কোন প্রতিষ্ঠান একই ধরনের পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারে, তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নাম বলেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি বড় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রশাসনের টানাপোড়েন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরপরই এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। শুক্রবার বিকেলেও সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণাটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং প্রেস পুলের কার্যক্রমে এর কী প্রভাব পড়বে—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

সিএনএন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনরত তাদের সাংবাদিকদের পাশে তারা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির বক্তব্য, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হলে তারা সেটিকে সাংবিধানিক অধিকারের ওপর বেআইনি হস্তক্ষেপ হিসেবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বলে জানিয়েছে।

পলিটিকোও জানিয়েছে, তারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রশাসনের বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখবে এবং প্রথম সংশোধনীর অধীনে তাদের অধিকার রক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হলে তা করবে। এমএস নাওয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়। এই কারণে সরকারি সংবাদ সম্মেলন বা প্রেস সুবিধায় কোনো সংবাদমাধ্যমকে তার প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জামেল জেফার বলেছেন, হোয়াইট হাউসের প্রেস সুবিধা সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত করার পর কেবল তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রতিবেদনের কারণে নির্দিষ্ট সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। একই ধরনের মত প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসও ট্রাম্পের ঘোষণার সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি বলেছে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের কারণে সরকারি কার্যক্রম থেকে তাদের দূরে রাখার সিদ্ধান্ত সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপ সাংবাদিকদের সরকারি তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। তার প্রথম মেয়াদেও হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। ২০১৮ সালে সিএনএনের সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টার প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন প্রত্যাহারের ঘটনা আদালতে গড়ায় এবং পরবর্তী সময়ে তার প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ট্রাম্প বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।

বর্তমান নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও সেই পুরোনো বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে এবার একসঙ্গে তিনটি বড় সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে ঘোষণাটি আসায় এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো সংবাদমাধ্যমকে বাদ দেওয়া হলে তা অন্য সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটি এখন আলোচনার বিষয়।

আইনি বিশেষজ্ঞদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সরকারি স্থানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে আইনি সীমারেখা কোথায়। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের কিছু ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তবে কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ পছন্দ না হওয়ার কারণে সেই প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হলে তা প্রথম সংশোধনীর আলোকে ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে।

এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক আদেশ বা বাস্তবায়ন কাঠামো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে নিষেধাজ্ঞাটি শুধু হোয়াইট হাউসের নির্দিষ্ট প্রেস সুবিধায় প্রযোজ্য হবে, নাকি সাংবাদিকদের পুরো কমপ্লেক্সে প্রবেশ বন্ধ করা হবে, কিংবা সংবাদ সংগ্রহের অন্য কোনো ব্যবস্থাও সীমিত করা হবে—তা স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার চেষ্টা হলে বিষয়টি আদালতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতীতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত আদালতের পর্যালোচনার মুখে পড়েছে। এবারও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো সাংবিধানিক অধিকারকে ভিত্তি করে আইনি চ্যালেঞ্জ করতে পারে বলে জানিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক আরও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট তার প্রশাসন সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন; অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সরকারি চাপ ছাড়াই সাংবাদিকতার কাজ করার অধিকার তাদের রয়েছে। এর ফলে বিরোধটি কেবল তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার নিয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

ট্রাম্প ইতোমধ্যে আরও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। ফলে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি না, এবং ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আদালত বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর চ্যালেঞ্জের মুখে কীভাবে এগোয়, সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত