গুলশানের নতুন ডিসি রুহুল কবীর খান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার
গুলশানের নতুন ডিসি রুহুল কবীর খান

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের নতুন উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের এক অফিস আদেশে তাকে গুলশান বিভাগের ডিসি হিসেবে পদায়নের কথা জানানো হয়। আদেশ অনুযায়ী, নতুন দায়িত্বে তাঁর পদায়ন অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

রুহুল কবীর খান ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের কর্মকর্তা। গুলশান বিভাগের দায়িত্ব পাওয়ার আগে তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ঢাকার তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফলে ঢাকা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি পুলিশ বিভাগের দায়িত্বে তাঁর নতুন করে ফেরা প্রশাসনিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন দায়িত্ব পাওয়ার ঠিক আগের দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রুহুল কবীর খানকে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশে বদলি করা হয়। এর পরদিনই ডিএমপির পক্ষ থেকে তাকে নির্দিষ্ট করে গুলশান বিভাগের ডিসির দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় বদলির পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগের দায়িত্ব পেলেন।

গুলশান বিভাগের নতুন ডিসি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং গ্রেপ্তারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশান থানার ৩ নম্বর সড়কের কাছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গেলে পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক ও ককটেল উদ্ধারের তথ্যও সামনে আসে।

ওই ঘটনার পর গুলশান বিভাগের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে গুলশান বিভাগের তৎকালীন ডিসি এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। একই সময়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এ পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদেশে প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে গুলশান বিভাগে নতুন নেতৃত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় রুহুল কবীর খানকে নতুন ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হলো। গুরুত্বপূর্ণ এই পুলিশ বিভাগের নেতৃত্বে পরিবর্তন এমন সময়ে হলো, যখন রাজধানীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

গুলশান রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে রয়েছে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট কার্যালয়, আবাসিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন ধরনের জনসমাগমের স্থান। ফলে এ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা শুধু স্থানীয় বাসিন্দা বা ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন ডিসির সামনে তাই একাধিক ধরনের দায়িত্ব থাকবে। নিয়মিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল, কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা এবং নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত না হয় এবং কোনো কর্মসূচি সহিংসতায় রূপ না নেয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক গুলশান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের পুলিশের সমন্বয়। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে বলে প্রতীয়মান হয়। নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আগাম তথ্য সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ের নজরদারি এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

গুলশানে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সাধারণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণও একটি বড় বিষয়। অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও এখানে ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা, মাদক, সড়ক নিরাপত্তা এবং যানজটের মতো নগরজীবনের বিভিন্ন সমস্যাও রয়েছে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, বিদেশি নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।

রুহুল কবীর খানের আগের দায়িত্বের অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তিনি আবার রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পেলেন। এর আগে তেজগাঁও বিভাগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় ঢাকা মহানগরের পুলিশি কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর পূর্বপরিচিতি রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় তাঁর বদলি এবং পরদিনই গুলশান বিভাগের ডিসি হিসেবে পদায়নকে পুলিশের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে নতুন দায়িত্বের বাস্তব চ্যালেঞ্জ থাকবে মাঠপর্যায়ে। কাগজে-কলমে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পুলিশের দৈনন্দিন কার্যক্রমে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষ করে গুলশানের মতো এলাকায় পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলক বেশি। বাসিন্দারা যেমন নিরাপদ চলাচল চান, তেমনি ব্যবসায়ী ও কূটনৈতিক মহলও স্থিতিশীল পরিবেশ প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও পুলিশের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো ধরনের বিস্ফোরণ বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি করে না, পুরো এলাকার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে।

১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর গুলশান বিভাগে নেতৃত্বের পরিবর্তন হওয়ায় নতুন ডিসির দায়িত্ব গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি নজর কাড়ছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে পরিচালিত হয়, রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে পুলিশের প্রস্তুতি কেমন থাকে এবং কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা কীভাবে আরও সমন্বিত করা হয়—এসব বিষয় সামনে থাকবে।

এদিকে গুলশান বিভাগে তৎকালীন কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের পর নতুন ডিসি নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনিক শূন্যতাও পূরণ হলো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পুলিশের অভ্যন্তরে দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন ডিসির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্ব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া।

রুহুল কবীর খান নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর গুলশান বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের ধরন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করাও তাঁর কাজের একটি অংশ হতে পারে।

গুলশানের মতো ব্যস্ত ও স্পর্শকাতর এলাকায় পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধী আটক বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, অভিযোগ গ্রহণে দ্রুততা, সড়কে শৃঙ্খলা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং জনসাধারণের আস্থা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর প্রশাসনিক নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন ডিসির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে গুলশান বিভাগে পুলিশের নেতৃত্বে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর এই পরিবর্তনের কারণে তাঁর ওপর দায়িত্বও কম নয়। গুলশানকে স্বাভাবিক, নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত পুলিশি কার্যক্রমের পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের গুলশান বিভাগের ডিসি হিসেবে পদায়ন শুধু একটি নিয়মিত বদলি বা পদায়ন নয়; সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর গুরুত্বপূর্ণ এই পুলিশ বিভাগের নেতৃত্বে এটি একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন। নতুন দায়িত্বে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা কতটা কাজে আসে এবং গুলশানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে পরিচালিত হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকবে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা অন্য কোনো পরিস্থিতিতেই যেন গুলশানের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত