নতুন পে স্কেলে গ্রেডভেদে বেতনে তৈরি হয়েছে অসংগতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
নতুন পে স্কেলে গ্রেডভেদে বেতনে তৈরি হয়েছে অসংগতি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন বেতন কাঠামো ঘিরে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন কিছু প্রশ্ন। গ্রেড যত ওপরে, মোট বেতনও তত বেশি হবে—সরকারি বেতন কাঠামোয় সাধারণত এমনটাই দেখা যায়। কিন্তু প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর গেজেটের হিসাব অনুযায়ী, কিছু গ্রেডের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। বাড়ি ভাড়া ভাতার হারে পার্থক্যের কারণে কোনো কোনো নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী তাঁদের তুলনামূলক উচ্চ গ্রেডের সহকর্মীর চেয়ে মাস শেষে বেশি মোট বেতন পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গেজেটের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ গ্রেডের তুলনায় ১৬ গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ৯৭৫ টাকা বেশি। একইভাবে ১৭ গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ১৫ গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ২৫০ টাকা বেশি। অথচ উভয় ক্ষেত্রেই ১৫ গ্রেডের মৌলিক বেতন বেশি। আবার ১৪ গ্রেডের তুলনায় ১৬ গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ৩০ টাকা বেশি হওয়ার হিসাবও সামনে এসেছে। বেতন কাঠামোর এই পার্থক্য মূলত বাড়ি ভাড়া ভাতার হার নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নতুন কাঠামোর হিসাব অনুযায়ী, ১৫ গ্রেডে মৌলিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এর সঙ্গে ৩৫ শতাংশ হারে ৭ হাজার ৯৮০ টাকা বাড়ি ভাড়া, ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা এবং ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা যোগ হলে মোট মাসিক বেতন দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৪৩০ টাকা।

অন্যদিকে ১৬ গ্রেডে মৌলিক বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ ১৫ গ্রেডের চেয়ে মৌলিক বেতন ৯০০ টাকা কম। কিন্তু এই গ্রেডে বাড়ি ভাড়া ভাতার হার ৪৫ শতাংশ হওয়ায় এ খাতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। চিকিৎসা, টিফিন ও মোবাইল ভাতা যোগ করে ১৬ গ্রেডে মোট মাসিক বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৫ হাজার ৪০৫ টাকা। অর্থাৎ ১৫ গ্রেডের তুলনায় ১৬ গ্রেডে মোট বেতন ৯৭৫ টাকা বেশি।

১৭ গ্রেডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এই গ্রেডে মৌলিক বেতন ২১ হাজার ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে ৪৫ শতাংশ হারে ৯ হাজার ৬৩০ টাকা বাড়ি ভাড়া, ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা, ৫০০ টাকা টিফিন এবং ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা যোগ করলে মোট বেতন দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা। ফলে ১৫ গ্রেডের তুলনায় মৌলিক বেতন ১ হাজার ৪০০ টাকা কম হলেও মোট বেতন ২৫০ টাকা বেশি হচ্ছে।

১৪ গ্রেডের হিসাবেও পার্থক্য রয়েছে। এ গ্রেডে মৌলিক বেতন ২৩ হাজার ৭০০ টাকা। ৩৫ শতাংশ হারে ৮ হাজার ২২৫ টাকা বাড়ি ভাড়া এবং অন্যান্য ভাতা যোগ করে মোট মাসিক বেতন দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৩৭৫ টাকা। ফলে ১৪ গ্রেডের চেয়ে ১৬ গ্রেডের মোট বেতন ৩০ টাকা বেশি হওয়ার হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।

কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একজন সরকারি কর্মচারী পদোন্নতি পেয়ে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার পর যদি বাড়ি ভাড়া ভাতার হার কমে যায়, তাহলে তাঁর মোট মাসিক আর্থিক সুবিধা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়বে কীভাবে। পদোন্নতির সঙ্গে দায়িত্ব ও পদমর্যাদা বাড়লেও যদি মোট বেতনে উল্টো চিত্র দেখা যায়, তাহলে গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর যৌক্তিকতা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন কর্মচারী সংগঠনের নেতারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যাটির অন্যতম কারণ হলো নতুন কাঠামোয় বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও ন্যূনতম টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। এর ফলে নির্দিষ্ট গ্রেডে মৌলিক বেতন কিছুটা কম হলেও বেশি শতাংশে বাড়ি ভাড়া পাওয়ার কারণে মোট বেতন তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

আগের বেতন কাঠামোতেও বাড়ি ভাড়া ভাতার ক্ষেত্রে শতাংশের পাশাপাশি ন্যূনতম অঙ্ক নির্ধারণ করা ছিল। ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকার উদাহরণে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সীমার মৌলিক বেতনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শতাংশ অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পাশাপাশি একটি ন্যূনতম অঙ্কও নিশ্চিত করা হতো। মৌলিক বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ভাড়ার হারও ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হতো। অন্যান্য এলাকার জন্যও ভিন্ন হার ও ন্যূনতম অঙ্ক নির্ধারিত ছিল।

নতুন বেতন কাঠামোতে শুধু শতাংশের ভিত্তিতে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের ফলে গ্রেডভেদে এমন অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে বলে কর্মচারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ। তাঁদের মতে, একটি গ্রেডের মৌলিক বেতন বাড়লেও যদি পরবর্তী গ্রেডে বাড়ি ভাড়ার হার কমে যায়, তাহলে মোট প্রাপ্য বেতন কাঠামোর স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না।

নতুন পে স্কেল তৈরির প্রক্রিয়ায় একাধিক পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা হলেও শেষ পর্যন্ত গেজেটে এমন অসংগতি কীভাবে থেকে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের পর অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বেতন কাঠামোর বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করেন। যাচাই-বাছাইয়ের সময় নানা ধরনের অসংগতি ধরা পড়লেও দ্রুত গেজেট প্রকাশের তাগিদে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যেই বাড়ি ভাতা নির্ধারণের এই বিষয়টি চূড়ান্ত কাঠামোয় থেকে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে।

অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. নাজমুল হুদা সিদ্দিকী এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বক্তব্য দিতে চাননি। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর দায়িত্বাধীন নয় এবং এ বিষয়ে অন্য কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠনের নেতারা অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সংগঠনগুলোর নেতাদের দাবি, তাঁদের জানানো হয়েছে যে নতুন কাঠামোর এই হিসাব সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী করা হয়েছে এবং গেজেট প্রকাশের পর সংশোধনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী জানিয়েছেন, ১২টি সংগঠনের জোট ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেছে। নতুন বেতন কাঠামোর অসংগতিগুলো সংশোধনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও অর্থ সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

কর্মচারী সংগঠনগুলোর আরেকটি উদ্বেগ বৈশাখী ভাতা নিয়েও। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান ব্যবস্থায় যে হারে এই ভাতা দেওয়া হয়, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ তার চেয়ে কম হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নতুন কাঠামোর বিভিন্ন সুবিধা ও ভাতা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো শুধু মাসিক আয় নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে পদোন্নতি, দায়িত্ব, অবসর সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনাও যুক্ত। একজন কর্মচারী যখন একটি গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডে উন্নীত হন, তখন তিনি সাধারণত আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করেন। তাই গ্রেড পরিবর্তনের পর মোট বেতনে অস্বাভাবিক পার্থক্য তৈরি হলে তা কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষের কারণ হতে পারে।

এখন নতুন পে স্কেলের এসব অসংগতি কীভাবে সংশোধন করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাড়ি ভাড়া ভাতার শতাংশের পাশাপাশি ন্যূনতম অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে কি না, কিংবা গ্রেডভিত্তিক ভাতার হার নতুন করে সমন্বয় করা হবে কি না—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি কর্মচারীরা।

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে এসব হিসাব পুনরায় যাচাই করা হলে গ্রেডভেদে মোট বেতনের অসামঞ্জস্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কর্মচারীদের প্রত্যাশা, নতুন পে স্কেলের মূল উদ্দেশ্য—দায়িত্ব ও গ্রেডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যৌক্তিক বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা—সেটি যেন বাস্তবায়িত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত