জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে তুর্কি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতির পর নিউইয়র্কে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীরা।

প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। পরে একটি মোটর শোভাযাত্রায় তাঁকে নিউইয়র্কের নির্ধারিত হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে তিনি ম্যানহাটনের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন বলে জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে বলে সফরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all’। বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, মানবিক সংকট এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো অধিবেশনের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীর সামনে কয়েক দিনের ব্যস্ত কর্মসূচি রয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের স্বাগত নাশতায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। পরে তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী কার্যক্রমে যোগ দেবেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনাতেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

২৩ সেপ্টেম্বরও প্রধানমন্ত্রীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। এদিন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। এরপর বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করছে বলে সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই দিনে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নির্ধারিত কর্মসূচি। ২৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। সেখানে মিয়ানমারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানানো হবে বলে সফরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে এ বৈঠককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরার কথা রয়েছে। উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় আসতে পারে।

২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততার মূল কেন্দ্র হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। ওই দিন তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ ও উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

একই দিনে বাংলাদেশের আয়োজিত দুটি সাইড ইভেন্টেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এর একটি মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি সেবা নিয়ে। সেখানে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমাতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও এ আলোচনায় তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনের পাশাপাশি নিউইয়র্ক সফরে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করবেন প্রধানমন্ত্রী। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ২৪ সেপ্টেম্বর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময়ও নির্ধারিত হয়েছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সচিবালয় ভবনে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।

জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সূচি রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সফরের আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাঁর আলোচনার কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব বৈঠককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর এবং পরবর্তী সময়ে হোটেলের পথে বাংলাদেশি প্রবাসীদের একাংশ তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হন। তাঁদের হাতে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন। বিভিন্ন স্লোগান ও করতালির মাধ্যমে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশের কাছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দেশের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক দলীয় সমর্থকদের কর্মসূচির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সফরের মূল গুরুত্ব থাকবে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আলোচনায়।

প্রধানমন্ত্রী ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন। সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত ১১টায় জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এই সফর বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক বিভিন্ন ইস্যু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বৈষম্য, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের মতো বিষয় নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাবেন।

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর কয়েক দিনের কর্মসূচিতে তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ভাষণ নয়, বরং বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের বিস্তৃত পরিসর রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর ভাষণ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়, সেটিই এখন সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সফর শেষে এসব বৈঠক ও আলোচনার ফলাফল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেদিকেও নজর থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত