খুলনায় ডেঙ্গুতে দুই অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু, আইসিইউ সংকট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
খুলনায় ডেঙ্গুতে দুই অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু, আইসিইউ সংকট

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক রাতের ব্যবধানে দুই অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সংকটাপন্ন অবস্থায় তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। একজনকে খুলনা থেকে ঢাকার পথে নেওয়ার সময় এবং অন্যজনকে খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছে। দুই পরিবারের স্বজনদের বর্ণনায় উঠে এসেছে চিকিৎসার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি, অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জনকে হারানোর গভীর বেদনার চিত্র।

নুসরাত জাহান ও তাঁর স্বামী নাহিদ হাসান তৃতীয় সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর রোববার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের দিন নির্ধারিত হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা নতুন অতিথিকে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমনকি অনাগত সন্তানের নামও ঠিক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আনন্দের সেই দিনটি শেষ পর্যন্ত পরিবারটির জন্য পরিণত হয় শোকে।

নাহিদ হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার নুসরাতের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। সেদিন তাঁর রক্তের প্লাটিলেট কমে ৬২ হাজারে নেমে যায়। তাঁকে খুলনা নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খোঁজেন। কোথাও শয্যা না পেয়ে রাতে নুসরাতকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও আইসিইউ শয্যা খালি ছিল না।

এরপর তাঁকে ঢাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর রোববার ভোরে ফরিদপুরের ভাঙ্গার কাছাকাছি নুসরাত নিস্তেজ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গর্ভের সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মা ও অনাগত সন্তান—কেউই বাঁচেনি।

নুসরাতের পরিবারের জন্য এই মৃত্যু ছিল একসঙ্গে একাধিক স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মতো। তাঁর স্বামী নাহিদ হাসান এখনও ঘটনার আকস্মিকতা মেনে নিতে পারছেন না। পরিবারের সদস্যদের কথায়, কয়েক দিন আগেও তাঁরা নতুন সদস্যকে ঘিরে আনন্দের পরিকল্পনা করছিলেন। অথচ চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই শেষ হয়ে যায় সেই অপেক্ষা।

একই সময়ে খুলনার আরেক বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাদিয়া আফরিন সুমাইয়া। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সুমাইয়ার মা ও বাবা দুজনেরই ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর তিনিও জ্বরে আক্রান্ত হন। কিন্তু গর্ভাবস্থার কারণে দেখা দেওয়া কোনো জটিলতা মনে করে শুরুতে তিনি হাসপাতালে যাননি।

শনিবার রাতে সুমাইয়ার শরীরে রক্তক্ষরণ শুরু হলে স্বজনরা দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু প্রথম হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাঁকে অন্য একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও আইসিইউ শয্যা খালি পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা অন্য হাসপাতালগুলোতেও যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোথাও শয্যা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রোববার ভোরে সুমাইয়ার মৃত্যু হয়।

সুমাইয়ার মা রিনা বেগম এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। সুমাইয়ার দেড় বছর বয়সী কন্যাশিশু কেয়া মাকে খুঁজছে। স্বজনদের ভাষ্য, শিশুটি বারবার জানতে চাইছে, তার মা কোথায়।

অন্যদিকে নুসরাতের পরিবারের ছোট সন্তানও মায়ের অনুপস্থিতি বুঝতে শুরু করেছে। খুলনা নগরীর সিদ্দিকীয়া মহল্লার পারিবারিক বাড়িতে পরিবারের সদস্যরা শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নুসরাতের ছয় বছর বয়সী মেয়ে রওদা হাসান এখনও পুরো পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেনি। পরিবারের সদস্যরা জানান, কখনও কখনও সে প্রশ্ন করছে, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’

নুসরাত বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। পরিবারের সদস্যদের মতে, তিনি নিজে মশাবাহিত রোগ নিয়ে সচেতন ছিলেন এবং সন্তানদেরও মশা থেকে দূরে রাখার বিষয়ে সতর্ক করতেন। অথচ শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুতেই তাঁর জীবন থেমে গেল।

দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনা সামনে এলেও খুলনার সরকারি ডেঙ্গু পরিসংখ্যানে তাঁদের নাম পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ ও জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৮৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার দাবি পাওয়া গেছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশন সরাসরি হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে ভর্তি বা মৃত্যুর তথ্য না এলে তা সরকারি হিসাবের আওতায় আসে না। ফলে কোনো রোগী অন্য জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে এবং ডেঙ্গু হিসেবে তথ্য নথিভুক্ত না হলে সরকারি পরিসংখ্যানে তাঁর নাম নাও থাকতে পারে।

দেশজুড়েও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ হাজার ৬৫৫ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৯০ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬২৭ জনে পৌঁছেছে।

ওই ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ২৭১ জন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ২৮১ জন, বরিশালে ২১৭, রাজশাহীতে ১৪৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৬৭, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬৬, ময়মনসিংহে ৪৩, রংপুরে ৪১ এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের চিকিৎসা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে একই সঙ্গে অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। তাই গুরুতর অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

খুলনায় আইসিইউ শয্যার সংকটের বিষয়টি তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যায় নেওয়া সম্ভব না হলে চিকিৎসকদের জন্যও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো দ্রুত জটিলতা তৈরি করতে পারে এমন রোগে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে সাতটি মেডিকেল ক্যাম্পও চালু রয়েছে।

তবে দুই পরিবারের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম নয়, সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল, আইসিইউ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি। একটি পরিবারের ক্ষেত্রে ঢাকার পথে রওনা হয়েও রোগীকে বাঁচানো যায়নি, আর অন্য পরিবারটি খুলনার একাধিক হাসপাতালে আইসিইউ খুঁজেও তা পায়নি।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা অবশ্য হিসাবের বাইরে। দুই পরিবার হারিয়েছে দুই মা, দুটি শিশু হারিয়েছে তাদের মাকে, আর দুটি পরিবারে অনাগত সন্তানের স্বপ্নও থেমে গেছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সময়মতো চিকিৎসা, সঠিক তথ্য সংরক্ষণ এবং গুরুতর রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামো নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত