প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আবারও লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে। কিছুদিন আগেও চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তুলনামূলকভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল। তখন বাজারে গিয়েও ক্রেতাদের মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজার পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। পণ্যের দাম একের পর এক বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাজার করা যেন প্রতিদিনের এক দুঃসহ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বাজার পরিদর্শনে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম কেজি বা লিটারপ্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ ও আলুর মতো প্রতিদিনের ব্যবহৃত পণ্যগুলোর দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। একসময় ৫০ টাকায় যে পরিমাণ শাকসবজি কেনা যেত, এখন একই পণ্য পেতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দাম।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাদের মুখে অসন্তোষ আর হতাশার ছাপ স্পষ্ট। মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণী জানালেন, “একটা সময় বাজারে গিয়ে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে সব কিনে ফেলতে পারতাম। এখন সেই বাজেট দ্বিগুণ করেও তালিকার সব জিনিস কেনা সম্ভব হচ্ছে না।” একই কথা বললেন পুরান ঢাকার এক চাকরিজীবী, যিনি জানিয়েছেন মাসের শেষ দিকে বাজারে যাওয়া এখন তাঁর কাছে একপ্রকার আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, তারা ইচ্ছা করেও পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে বলে খুচরা বিক্রয়েও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্যামবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরাও চাই দাম কম থাকুক, যাতে ক্রেতারা বেশি কেনাকাটা করে। কিন্তু সরবরাহে সমস্যা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি দামে ক্রমাগত চাপ পড়ছে। ফলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে।”
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, নিত্যপণ্যের দামের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনে নানা ধরনের বাধা—সব মিলিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। উপরন্তু মৌসুমি প্রভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কারসাজিও বাজার অস্থিরতার জন্য দায়ী বলে তারা মনে করেন।
সরকারি সংস্থাগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান নয়। টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম চলমান থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে হলে সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং মৌলিক পণ্যের আমদানি ও সংরক্ষণ নীতিতে সংস্কার আনা জরুরি।
এক সময় যে বাজারে মানুষের মুখে ছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস, সেখানে এখন ভর করেছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই আশা, কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে নিত্যপণ্যের দাম আবার মানুষের হাতের নাগালে ফিরে আসে এবং বাজারে স্থিতি ফিরে আসে।