বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নতুন শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৬ বার

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র ও জলসম্পদ ব্যবহারের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বঙ্গোপসাগর শুধু মৎস্য আহরণের জায়গা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন শিল্প গড়ে তোলার অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, সমুদ্রের অফুরন্ত সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, পাশাপাশি লাখো মানুষের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে। এজন্য প্রয়োজন গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সমুদ্রভিত্তিক শিল্প ও সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করা।

সোমবার রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৫ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের মৎস্য খাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ নারীসহ লাখ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ ধরা, চাষাবাদ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এদের অনেকেই প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন, যা তাদের জীবন ও জীবিকার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ড. ইউনূস মৎস্যজীবীদের প্রতি সহমর্মিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষ মাছের দাম বা টাটকাতা নিয়েই বেশি চিন্তা করে, কিন্তু যারা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে এই মাছ আমাদের কাছে পৌঁছে দেন, তাদের জীবনের সংগ্রাম অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। তিনি বলেন, “আজকের দিনটি অন্তত সেই প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কথা স্মরণ করার দিন।”

প্রধান উপদেষ্টা অবৈধ জাল ব্যবহার, নির্বিচার মাছ আহরণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযাচিত শোষণকে ‘প্রকৃতির প্রতি নির্মমতা’ আখ্যায়িত করেন। এ বিষয়ে সরকার যেমন কঠোর অবস্থান নেবে, তেমনি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগামী প্রজন্ম যেন এই প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

তার বক্তব্যে জলাশয় দূষণ, বালাইনাশকের অতি ব্যবহার, তামাক চাষ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কথাও উঠে আসে। তিনি জানান, শত শত দেশীয় মাছ হারিয়ে যাচ্ছে যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ময়মনসিংহে ‘লাইফ জিন ব্যাংক’ স্থাপন করা হয়েছে, যাতে দেশীয় প্রজাতিগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায়।

ড. ইউনূস সতর্ক করে বলেন, প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণ না করলে মাছও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। তিনি বলেন, “আমরা প্রকৃতিকে শুধু ভোগ করছি, অথচ তার প্রতি সদয় হওয়ার কথা ভাবছি না। দুনিয়ার সব বর্জ্য আমরা পানির মধ্যে ফেলছি। যে পানি আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য, সেটিকে বিষাক্ত করে তুলছি।”

তিনি আরও বলেন, “মাছ আমাদের জন্য প্রকৃতির উপহার। এটি কারখানায় তৈরি নয়, এটি শ্রমিকের তৈরি নয়। আল্লাহর দান—যা আমরা সহজে পেয়ে যাই। কিন্তু আমরা নদীকে শাসন করার কথা বলি, পালন করার কথা বলি না। অথচ শাসনের নামে আমরা নদীর প্রতি অমানবিক আচরণ করছি। পানির প্রতি যত অবহেলা করছি, তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।”

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মৎস্যজীবীদের সামাজিক সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি ও বাজার সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হবে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের পাশে দাঁড়ানো এবং ভ্যালু-অ্যাডিশনের মাধ্যমে মাছকে আরও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলা।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেনও বক্তব্য রাখেন। এ সময় নয়টি ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক ২০২৫ প্রদান করা হয়।

এবারের মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য—“অভয়াশ্রম গড়ে তুলি, দেশি মাছে দেশ ভরি।” সারা সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাছ চাষ, সঠিকভাবে মাছের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ, এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও পরিবেশের টেকসই রূপরেখা অঙ্কন করেছেন, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে অগ্রগতির পথ খোঁজা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত