প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনা ঋণ প্রাপ্তির পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের পানি সম্পদ উন্নয়নের এ মহাপরিকল্পনার জন্য চীনের কাছে মোট ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনা পক্ষ ইতিমধ্যেই সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং দুই দেশের মধ্যে আর্থিক চুক্তি (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট) এ বছরের মধ্যেই সই করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অফ তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বা সংক্ষেপে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙন ও পানি সংক্রান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর ভাঙন ও পানি অভাবের কারণে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর ও দিনাজপুরের নদীপাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু ও জীবন-জীবিকার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৭৫ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে, যার মধ্যে চীনের কাছ থেকে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার। বাকি অর্থ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে যোগ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হবে ২০২৬ সালে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না ইতিমধ্যেই প্রকল্পের সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। সমীক্ষার ফলাফলে নদীর গভীরতা বাড়ানো, নদীভাঙন রোধ, বাঁধ নির্মাণ ও চর খননসহ নদী পুনরুদ্ধারের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ে পর্যটন নগরী, পরিকল্পিত শহর, হোটেল ও রেস্তোরাঁ নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। নদীটি ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চীনা বিনিয়োগের সঙ্গে ভারতীয় স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের ঋণ এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা প্রকল্পের জন্য সহায়ক হলেও, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পর্যাপ্ত পানির জন্য ভারতের সঙ্গে সমঝোতা অপরিহার্য।
এছাড়া তিস্তা নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশের ভারতসহ পুরোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধও প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে জটিলতা সৃষ্টি করছে। ১৯৮৩ সালে ভারতের সঙ্গে একটি অস্থায়ী পানি বণ্টন চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু স্থায়ী চুক্তি কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১১ সালের ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় স্থায়ী চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। বর্ষা মৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ভাঙন রোধ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা—এই তিনটি কারণে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভারতীয় স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় ধরনের নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে।
বর্তমান সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ঋণ ও প্রযুক্তি সহযোগিতাকে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করা, নদীর পানির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য বাধা মোকাবিলা করা।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ১০২ কিলোমিটার নদীতে খনন, ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, চর ও কৃষিজমি উদ্ধার এবং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।