খাগড়াছড়ি- চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-মহাসড়ক অবরোধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৯৪ বার
খাগড়াছড়ি- চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-মহাসড়ক অবরোধ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী নেতা মাওলানা সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। হাটহাজারী-রাউজান মহাসড়কে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হওয়ার পর ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বুধবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। সকাল ৭টা থেকেই পুরো এলাকা অচল হয়ে পড়ে, বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল, আর তীব্র দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও সাধারণ যাত্রীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকেই হাটহাজারী কলেজ গেইট, হাটহাজারী বাজার, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির প্রবেশদ্বার হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা জড়ো হন। তারা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বাঁশ, টায়ার ও বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেন। তাদের দাবি—মাওলানা সোহেল চৌধুরীর মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি “পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড”। ফলে পুরো চট্টগ্রাম-রাঙামাটি এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইমরান শিকদার বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে শান্তির দ্বীপ এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস হঠাৎ পেছন দিক থেকে এসে মাওলানা সোহেল চৌধুরীকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় আশপাশে থাকা কর্মীরা বাসটিকে আটকানোর চেষ্টা করলেও সেটি দ্রুত পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর হেফাজতের নেতাকর্মীরা মরদেহ ও বাসটির তথ্য নিয়ে রাউজান হাইওয়ে থানায় মামলা করতে গেলে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মাওলানা ইমরান শিকদারের অভিযোগ, “পুলিশ আমাদের নিজেদের মতো করে এজাহার লেখার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আমরা চাইছিলাম মামলায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে। পুলিশ তাতে রাজি হয়নি এবং মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।” তার দাবি, পুলিশ যদি সঠিকভাবে মামলা নিত, তাহলে আজকের মতো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

ঘটনার জেরে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা বুধবার ভোর থেকেই কর্মীদের নিয়ে মাঠে নামেন এবং হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সড়কের দু’পাশে হাজারো যানবাহন আটকে পড়ে, যার ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম শহর থেকে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফটিকছড়ি ও রাউজানমুখী বাস ও ট্রাক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে, সকাল থেকে অবরোধ চলায় চরম দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। অফিসগামী সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা আটকে পড়েন সড়কে। অনেকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুলগামী শিশুদের গাড়ি আটকে পড়ায় তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়।

হেফাজতের স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, তাদের এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হলেও পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি আমলে না নিলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবেন। মাওলানা ইমরান শিকদার বলেন, “আমাদের কেন্দ্রীয় নেতার মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। আমরা বিশ্বাস করি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা সঠিক তদন্ত ও বিচারের দাবি করছি।”

অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকাল থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হাটহাজারী ও রাউজান এলাকায় অতিরিক্ত ফোর্স পাঠানো হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমরা পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা চলছে যাতে সড়ক অবরোধ তুলে নেয়া হয়। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা হয়নি।”

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই দাবি করছেন, হেফাজত নেতা সোহেল চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির নানা ইস্যুতে সরব ছিলেন। তিনি সম্প্রতি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকীকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন। তাই তার মৃত্যু নিয়ে নানা গুজবও ছড়িয়ে পড়ছে।

হাটহাজারী-রাউজান অঞ্চলে হেফাজতের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই সুপ্রতিষ্ঠিত। হাটহাজারী মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির সাংগঠনিক শক্তি এখান থেকেই বিস্তার লাভ করেছে। ফলে এই অঞ্চলে তাদের যেকোনো প্রতিবাদ বা অবরোধ দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, “যখনই হাটহাজারীতে উত্তেজনা তৈরি হয়, পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও কম নয়।”

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সড়ক দুর্ঘটনার ইস্যু নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর সামাজিক প্রতিফলন। বিশেষত হেফাজতের মতো সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতার মৃত্যুকে ঘিরে এ ধরনের উত্তেজনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক আস্থার অভাব এখনো রয়ে গেছে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক বরাবরই টানাপোড়েনপূর্ণ। একদিকে প্রশাসন সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে হেফাজত তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে শক্তি প্রদর্শন করে। এই জটিল সম্পর্কের মধ্যেই ঘটে গেছে মাওলানা সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনা, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

দিনভর অবরোধের ফলে হাটহাজারী ও আশপাশের এলাকা অচল হয়ে পড়লেও বিকেল নাগাদ স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনা চলমান আছে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা যাতে না ঘটে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

তবে হেফাজতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে—তারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। মাওলানা ইমরান শিকদার বলেন, “আমরা ন্যায়বিচার চাই। যদি প্রশাসন সত্যিকারের তদন্ত না করে, তবে আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে।”

সন্ধ্যা নাগাদ চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির যোগাযোগ কিছুটা পুনরায় শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। বাস ও ট্রাক চলাচল সীমিত আকারে শুরু হলেও অনেক যাত্রী এখনো পথে আটকা।

চট্টগ্রামের প্রশাসন বলছে, ঘটনার মূল কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হেফাজতের দাবি, এই তদন্ত নিরপেক্ষ না হলে জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়বে।

ঘটনাটি এখন শুধু একটি স্থানীয় দুর্ঘটনা নয়, বরং জাতীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলো এখনো কতটা প্রভাবশালী এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা কীভাবে একটি দুর্ঘটনাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ দিতে পারে।

পরিস্থিতি এখন প্রশাসনের কূটনৈতিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং গণআস্থার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। হেফাজতের নেতা সোহেল চৌধুরীর মৃত্যু দেশের ধর্মীয় রাজনীতির অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যার প্রভাব শুধু হাটহাজারী নয়, পুরো বাংলাদেশেই পড়বে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com