প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের চৌকাঠ পেরোতে ব্যর্থ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩২ বার
এইচএসসি ফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন শুরু আজ

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, তবে এবারের ফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মুখে হাসির চেয়ে হতাশার ছাপই বেশি। কারণ, প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই এ বছর উচ্চমাধ্যমিকের চৌকাঠ পেরোতে পারেননি। পাসের হার গত বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। গত বছর যেখানে গড় পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সেখানে এ বছর তা নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এই ফলাফল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফলাফল ঘোষণা করেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দকার এহসানুল কবির। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার। সকাল ১০টার পর থেকেই দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে ফলাফল প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা সঙ্গে সঙ্গেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও হতাশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর মোট ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই এবার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। ছাত্রীদের পারফরম্যান্স ছিল তুলনামূলক ভালো; মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬ জন, যা ছাত্রদের চেয়ে ৮৭ হাজার ৮১৪ জন বেশি। ছাত্রদের পাসের হার ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, আর ছাত্রীদের ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। একইভাবে, জিপিএ-৫ অর্জনেও এগিয়ে মেয়েরা; মোট ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৭ হাজার ৪৪ জন ছাত্রী এবং ৩২ হাজার ৫৩ জন ছাত্র।

সব বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইংরেজি, গণিত, উচ্চতর গণিত ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে কঠিন প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জানিয়েছেন, প্রশ্নের ধরন আগের বছরের তুলনায় ভিন্ন ও জটিল ছিল। বিশেষ করে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ও গণিতে প্রশ্নের কাঠামো অনেকেরই বোধগম্য হয়নি। রাজশাহী ও যশোর বোর্ডের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, এই পরিবর্তিত প্রশ্নপদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি, ফলে তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে ফলাফলে।

বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও দেখা যাচ্ছে, সব বোর্ডেই পাসের হার কমেছে। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যশোরে ৫০ দশমিক ২০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, বরিশালে ৬২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, সিলেটে ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। মাদরাসা বোর্ডে পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

ঢাকা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন শিক্ষার্থীরা—সংখ্যা ২৬ হাজার ৬৩ জন। এরপর রাজশাহী বোর্ডে ১০ হাজার ১৩৭ জন, যশোরে ৫ হাজার ৯৯৫ জন, দিনাজপুরে ৬ হাজার ২৬০ জন, চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৯৭ জন, কুমিল্লায় ২ হাজার ৭০৭ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৬৮৪ জন, বরিশালে ১ হাজার ৬৭৪ জন, সিলেটে ১ হাজার ৬০২ জন, মাদরাসা বোর্ডে ৪ হাজার ২৬৮ জন এবং কারিগরিতে ১ হাজার ৬১০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

অন্যদিকে, এবার শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০২টি, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৪ সালে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৮৮টি। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও সামগ্রিকভাবে ফলাফলে পতন ঘটেছে, তবে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, অনেক বিদ্যালয়ে অন্তত শিক্ষার্থীরা মৌলিক স্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার মতো প্রস্তুতি নিতে পেরেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন পাঠ্যক্রম ও প্রশ্নপদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় পরিবর্তন ছিল। অনেক বিদ্যালয় এখনো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। পরীক্ষার আগে পর্যাপ্ত মক টেস্ট বা রিভিউ ক্লাসের ঘাটতিও শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে এই ফলাফলটা একটা ‘ট্রানজিশনাল শক’ হিসেবেই দেখা উচিত।”

অন্যদিকে, শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করেন, ফলাফল কমলেও এটি মানোন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাদের মতে, আগের বছরগুলোর মতো সহজ প্রশ্নপত্রে বেশি পাসের হার দেখানো হলেও তা প্রকৃত শিক্ষার প্রতিফলন নয়। এবারের কঠোর মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের নানা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। কেউ কেউ ফলাফল নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকেই হতাশা বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক শিক্ষার্থী লিখেছে, “আমার পরিশ্রম বৃথা গেল না, তবে বন্ধুরা কেউ কেউ খুব কষ্টে আছে।” অন্য এক অভিভাবক মন্তব্য করেছেন, “প্রশ্ন কঠিন হোক, তবু যদি শিক্ষার মান বাড়ে, সেটা দেশের জন্য ভালো।”

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এখন জোর দিচ্ছেন ফলাফল বিশ্লেষণের ওপর, যেন ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য না হয়। তাদের মতে, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর শেখার সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি।

ফলাফল যতই হতাশাজনক হোক, শিক্ষার্থীদের জন্য এটি কোনো শেষ নয়—বরং নতুনভাবে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ। এইচএসসি ফলাফল জীবনের এক ধাপমাত্র, যা ভবিষ্যতের শিক্ষার ও পেশাগত যাত্রার পথ তৈরি করে দেয়। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের আশা, এ বছরের এই ফলাফল শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরির পথ উন্মুক্ত করবে।

যেভাবেই দেখা হোক, আজকের এইচএসসি ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক সতর্ক সংকেতও বটে—যেখানে সংখ্যার চেয়ে এখন গুণগত শিক্ষাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত