এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন ৬৯ হাজার ৯৭ শিক্ষার্থী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন ৬৯ হাজার ৯৭ শিক্ষার্থী

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড একযোগে এ ফলাফল প্রকাশ করে। ফলাফলে দেখা গেছে, এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী। তবে সামগ্রিক পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম।

রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ বছর মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে রয়েছে—পাসের হার, জিপিএ-৫, এবং সামগ্রিক ফলাফলে। মোট ৩৭ হাজার ৪৪ জন ছাত্রী এবং ৩২ হাজার ৫৩ জন ছাত্র জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এ বছর এইচএসসির গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ হলেও সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাসের হার আরও কিছুটা কম—৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। মাদরাসা বোর্ডে (আলিম) পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। শিক্ষাবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ আনন্দে উচ্ছ্বসিত, আবার কেউ হতাশা প্রকাশ করেছেন।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় গত ২৬ জুন এবং শেষ হয় ১৯ আগস্ট। পরবর্তীতে কয়েকটি স্থগিত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয় নির্ধারিত সময়ের কিছুদিন পর। নিয়ম অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশ করা হয়, আর সেই সময়সূচি মেনেই আজকের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।

এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেন। এর মধ্যে ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬ জন ছাত্রী। তবে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। ফলে প্রায় সোয়া ১২ লাখ শিক্ষার্থী এবার ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন।

বোর্ড অনুযায়ী অংশগ্রহণের সংখ্যা ভিন্ন হলেও প্রতিটি বোর্ডেই এ বছর প্রশ্নের কঠিনতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে পাসের হার কমেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বোর্ডে অংশ নেয় ২ লাখ ৯১ হাজার ২৪১ জন শিক্ষার্থী, রাজশাহীতে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২৪২ জন, কুমিল্লায় ১ লাখ ১ হাজার ৭৫০ জন, যশোরে ১ লাখ ১৬ হাজার ৩১৭ জন, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৩৫ জন, বরিশালে ৬১ হাজার ২৫ জন, সিলেটে ৬৯ হাজার ৬৮৩ জন, দিনাজপুরে ১ লাখ ৩ হাজার ৮৩২ জন এবং ময়মনসিংহে ৭৮ হাজার ২৭৩ জন। এছাড়া মাদরাসা বোর্ডে ৮৬ হাজার ১০২ জন এবং কারিগরি বোর্ডে ১ লাখ ৯ হাজার ৬১১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মেয়েরা শুধু পাসের হারেই নয়, বরং গড় নম্বরের দিক থেকেও এগিয়ে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ প্রবণতা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক ইতিবাচক দিক নির্দেশ করছে। সমাজে মেয়েদের শিক্ষা ও আত্মপ্রত্যয়ের অগ্রগতি এ ফলাফলের মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়া শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, “ফলাফল তুলনামূলক কম হলেও এটা শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি বাস্তব প্রতিফলন। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতা যাচাইয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ফলাফলে এ পরিবর্তন এসেছে।”

এবারের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা। শিক্ষার্থীরা তাদের অনুভূতি জানাচ্ছে ফেসবুক ও এক্স (টুইটার)-এ। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, কঠিন প্রশ্নপত্র কি সত্যিই মানোন্নয়নের নির্দেশক, নাকি এটি শিক্ষার্থীদের উপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে? একইসঙ্গে অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, নতুন পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার কাঠামোর পরিবর্তনে শিক্ষার্থীরা এখনো পুরোপুরি অভ্যস্ত নয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষা বোর্ডগুলোর এ পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষা বিশ্লেষক ড. ফারজানা রহমান বলেন, “যদি পাঠ্যপদ্ধতি আধুনিক হয়, তবে মূল্যায়নও সে অনুযায়ী হতে হবে। কিন্তু নতুন পাঠ্যক্রমে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উভয়েই বিভ্রান্ত হয়েছেন। ফলে ফলাফলে এমন তারতম্য এসেছে।”

অন্যদিকে, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তাসনিম নওরিন বলেন, “পরীক্ষা অনেক কঠিন ছিল, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের ফল আমি পেয়েছি। ফল হাতে পাওয়ার মুহূর্তটা জীবনের সেরা সময়।” অপরদিকে, ময়মনসিংহ বোর্ডের একজন শিক্ষার্থী বলেন, “গণিত ও ইংরেজিতে কঠিন প্রশ্নের কারণে অনেকের ফল খারাপ হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে প্রশ্নের মান কঠিন হলেও প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হবে।”

ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন আগামী ১৭ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত করা যাবে, যা শুধুমাত্র অনলাইনে করতে হবে। শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে (https://rescrutinu.eduboardresult.gov.bd) আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

ফলাফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎসবের আমেজ দেখা গেলেও, কোথাও কোথাও ছিল নীরবতা ও হতাশা। কেউ কেউ বলছেন, এ ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে, কেউ এটিকে শিক্ষার্থীদের উপর চাপ হিসেবে দেখছেন।

যেভাবেই দেখা হোক না কেন, ২০২৫ সালের এইচএসসি ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। যেখানে শুধুমাত্র পাসের হার নয়, বরং শিক্ষার্থীর দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব প্রয়োগ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন হয়তো অনেকের কাছে কঠিন, কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়নের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত