রাকসু নির্বাচনে শিবিরের জোয়ার, ২৩ পদের ২০টিতেই জয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪০ বার
রাকসু নির্বাচনে শিবিরের জোয়ার, ২৩ পদের ২০টিতেই জয়

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ৩৪ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো বহুল প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই নির্বাচন শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বহু আলোচিত এই নির্বাচনে যে ফলাফল উঠে এসেছে, তা একদিকে চমকপ্রদ, অন্যদিকে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

এই নির্বাচনে ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। বাকি তিনটি পদে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা—সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে সালাহউদ্দিন আম্মার, ক্রীড়া সম্পাদক পদে নার্গিস আক্তার এবং বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক পদে তোফায়েল আহমেদ তোহা। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সেতাউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গোটা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা মিছিল, স্লোগান ও উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে।

ভিপি পদে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৮৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের শেখ নূর উদ্দীন আবির পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৩৯৭ ভোট। ফলে ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২৯০, যা রাকসুর নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম বড় ব্যবধান হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নাটকীয় লড়াইয়ের পর জয় এসেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাহউদ্দিন আম্মারের ঝুলিতে। তিনি পেয়েছেন ১১ হাজার ৫৩৭ ভোট, আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির সমর্থিত ফজলে রাব্বি ফাহিম রেজা পেয়েছেন ৫ হাজার ৭২৯ ভোট। ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮০৮ ভোটে। শিক্ষার্থীরা এই ফলাফলকে ‘স্বাধীন প্রার্থীর বিজয়ের প্রতীকী বার্তা’ হিসেবে দেখছেন।

সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে জয়ী হয়েছেন ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর সালমান সাব্বির। তিনি ৬ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকেন ছাত্রদল সমর্থিত জাহিন বিশ্বাস এষার চেয়ে, যিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৪১ ভোট। ভোটের ব্যবধান মাত্র ১ হাজার ৩০ হলেও শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত হয় শিবির সমর্থিত প্রার্থীর।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি একাডেমিক ভবনের ১৭টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পুরো প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও দিনজুড়ে বিভিন্ন হলে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও সামান্য বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়। তবে প্রশাসনের কঠোর তদারকির কারণে বড় কোনো সংঘর্ষ বা অরাজকতা ঘটেনি। ভোট শেষে রাতেই কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ভোট গণনা শুরু হয় এবং শুক্রবার সকালে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ১৭ হাজার ৫৯৬ জন এবং ছাত্রী ভোটার ১১ হাজার ৩০৫ জন। সার্বিকভাবে ভোট পড়েছে ৬৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ কিছুটা কম হলেও ছয়টি নারী হলে ভোটের হার ছিল ৬৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রমাণ করেছে যে রাকসু এখনও শিক্ষার্থীদের কাছে গণতন্ত্রচর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জায়গা করে আছে।

ঘোষিত ফলাফলকে ঘিরে শিবির সমর্থিত প্যানেলের নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এই ফলাফল ছাত্রসমাজের আস্থা ও সংগঠনের সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রতিফলন। অন্যদিকে, পরাজিত প্যানেলের নেতারা নির্বাচনে অনিয়ম ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন, যদিও প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা তা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

রাকসুর নির্বাচনী ইতিহাসে এই নির্বাচন নতুন এক অধ্যায় রচনা করল। একদিকে দীর্ঘ স্থবিরতার অবসান, অন্যদিকে শিবিরের ব্যাপক সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা রাজনীতি করতে চাই, কিন্তু সহিংসতা নয়—এবারের নির্বাচন সেই পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে।”

অন্যদিকে শিক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, এত বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে তারা একই সঙ্গে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন নির্বাচিত নেতারা শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও শিক্ষা পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করেন, রাজনৈতিক সংঘাত নয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে এক নতুন ধারা সূচিত হলো। ফলাফল যেমন বিস্ময়কর, তেমনি এটি ভবিষ্যতের শিক্ষাঙ্গনে নতুন সম্ভাবনা ও প্রশ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে—গণতান্ত্রিক চর্চার এই যাত্রা কত দূর এগোবে, এখন সেটিই সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত