প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চলমান বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য দাবির বৈঠক ও আলোচনার পরও দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সোমবার আবারও কর্মবিরতি পালন করছেন। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষক সম্প্রদায়ের ধৈর্য্য শেষের পথে এবং তাদের দাবির বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
গত রোববার রাতে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মবিরতি স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। এক্ষেত্রে শিক্ষক নেতারা গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, কর্মবিরতি ‘আপাতত স্থগিত’ থাকবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য অধিদপ্তরও একই তথ্য নিশ্চিত করে।
তবে মধ্যরাতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা নিজ সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনেন। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি “আমার দেশ”কে নিশ্চিত করেছেন, দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মবিরতি চলবে এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মবিরতি এবং অবস্থান কর্মসূচি দুটোই চলবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামানো হবে না।’
পরিষদের এক নেতা জানান, বৈঠকে অগ্রগতি থাকলেও শহীদ মিনারে উপস্থিত সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তাঁদের তোপের মুখে আন্দোলনরত নেতাদের পুনঃবিবেচনা করতে হয়। শিক্ষক সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং অধিকার রক্ষার ইচ্ছা এই সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনার পথে প্রেরণা দিয়েছে।
অন্যদিকে, আজ সোমবার শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বৈঠক করবেন। বৈঠকে শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধিসহ তিন দফা দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন। সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করার চেষ্টা করবেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তবে শিক্ষকরা এখন দশম গ্রেডের দাবি করছেন। এটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নির্ধারণ করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। আমরা আশা করি, শিক্ষকরা কর্মবিরতি স্থগিত রেখে আলোচনার পথ ধরে যাবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সচিবালয়ে বৈঠকে আলোচনার জন্য আমরা দ্রুত সাড়া দিয়েছি এবং দরজা খোলা রেখেছি। তাই কর্মবিরতি এখনও চলতে থাকাটা দুঃখজনক হলেও আমরা আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা যাবে।’
শিক্ষক আন্দোলনের পটভূমি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রাথমিক শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধি, অন্যান্য সুবিধা এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা দাবি বাস্তবায়নই মূল দাবিগুলো। এই দাবির সঙ্গে সরকারী নীতিমালা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মিল খুঁজে বের করাই এখন আলোচনার মূল বিষয়। আন্দোলনরত শিক্ষকরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদান স্থগিত হওয়া একটি তুচ্ছ বিষয় নয়, বরং এটি সরকারের প্রতি শিক্ষকদের আন্দোলনের জোরালো বার্তা।
কর্মবিরতি চলাকালীন ঢাকা শহীদ মিনারে অবস্থান নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষকরা আশা করছেন, সরকারের প্রতি চাপ বাড়বে এবং তাদের দাবির বাস্তবায়ন দ্রুত হবে। এই অবস্থান কর্মসূচি, শুধু রাজধানীতে নয়, প্রাদেশিক শহরগুলিতেও সমর্থকদের মধ্যে এক প্রকার আন্দোলন ছড়াবে। শিক্ষকদের ধৈর্য্য ও সংহতি আন্দোলনের শক্তিকে আরও বৃদ্ধি দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে শিক্ষকদের এই কর্মবিরতি এবং আন্দোলন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে যথাযথ সমাধান প্রদানের চেষ্টা করবেন। তবে শিক্ষকদের দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষকদের আন্দোলন ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে শিক্ষক নেতারা মনে করেন, তাঁদের এই কর্মসূচি মূলত সঠিক দাবির বাস্তবায়নের জন্য। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় এবং বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। শিক্ষক সমিতির নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বৈঠকের পরেই যদি কোনো সমাধান না আসে, তবে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।
এই পরিস্থিতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারি শিক্ষকেরা কতটা একতাবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে সক্ষম তা তুলে ধরছে। প্রাথমিক শিক্ষকরা তাদের সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং যথাযথ বেতন-বৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলন অব্যাহত রাখার পথে। তাদের এই সিদ্ধান্ত একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে যে, শিক্ষকদের দাবির প্রতি নজর দিতে সরকারকে বাধ্য করা সম্ভব।
পরিস্থিতি এখনো অচল নয়, তবে শিক্ষকরা সংহত এবং সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে দাবির বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় মনোভাব দেখাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ১১তম গ্রেড ও আলোচনার প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলতে থাকবে। এতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষক সম্প্রদায়ের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।