প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি আর অঝোর ধারার বর্ষণে স্থবির হয়ে পড়েছে ভারতের বাণিজ্যনগরী মুম্বাইসহ পার্শ্ববর্তী পুনে ও এর আশপাশের জেলাগুলো। গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে জলের নিচে এবং ধসে পড়েছে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যা গোটা এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। ভারি বর্ষণের জেরে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় মুম্বাই-পুনে করিডরে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) মুম্বাই, পুনে, থানে, রায়গড় এবং পালঘরের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোর জন্য রেড অ্যালার্ট জারি করেছে এবং একটানা ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই লোনাভালা এবং কারজাতের মধ্যবর্তী ভোরঘাট অংশে একাধিক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে, যা মুম্বাই-পুনে রেল করিডরের স্বাভাবিক যাত্রাপথকে তছনছ করে দিয়েছে। রেললাইনের ওপর বিশাল আকারের পাথর এবং পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ায় রেল ট্র্যাকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ডেকান কুইন, ইন্দ্রায়ণী এক্সপ্রেসসহ জনপ্রিয় একাধিক আন্তঃনগর ট্রেন বাতিল করতে হয়েছে অথবা ভিন্ন পথে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করে যাচ্ছেন যাতে দ্রুত রেলপথ পরিষ্কার করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা যায়। তবে বৃষ্টির তীব্রতায় উদ্ধারকাজে বারবার বিঘ্ন ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সড়ক যোগাযোগের চিত্র আরও ভয়াবহ। মুম্বাই-পুনে এক্সপ্রেসওয়ে এবং পুরনো মুম্বাই-পুনে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ভূমিধসের কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এক্সপ্রেসওয়ের টানেল-২-এর কাছে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে মুম্বাইমুখী সড়কটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাভাল ও তামহিনি ঘাটের বিকল্প সড়কগুলোও বন্যার পানির তোড়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে জরুরি প্রয়োজনে ছাড়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন জায়গায় আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বৃষ্টির এই ভয়াবহতা কেবল যান চলাচলকেই থামিয়ে দেয়নি, বরং শহরের হৃদস্পন্দনকেও স্তব্ধ করে দিয়েছে।
মুম্বাই মহানগর অঞ্চলে বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১০টি প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনা হৃদয়বিদারক। মানখুর্দে একটি তিনতলা ভবন ধসে ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। কুরলা এলাকায় রাস্তার পাশের একটি দোকানের ওপর গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনায় ৬৩ বছর বয়সী এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। চেম্বুর এলাকায় একটি স্কুলবাসের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু গোটা শহরকে শোকাচ্ছন্ন করে তুলেছে। সাকি নাকায় বন্যার পানির নিচে ঢাকা একটি খোলা ম্যানহোলে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে, যা শহরের নিকাশি ব্যবস্থার নাজুক অবস্থাকেও সামনে এনেছে। খারঘরের নিষিদ্ধ পান্ডাভকাড়া জলপ্রপাতের টানে জলমগ্ন হয়ে দুই তরুণের সলিল সমাধি হয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই প্রকৃতির ভয়াবহ রূপের করুণ দলিল হয়ে থাকবে।
শহরের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত মুম্বাইয়ের লোকাল ট্রেন চলাচলও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। রেল লাইনগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে ট্রেনগুলো বিলম্বে চলছে এবং যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সেন্ট্রাল ও ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুম্বাই, পুনে, থানে এবং নবি মুম্বাইয়ের স্কুল-কলেজগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ডাব্বাওয়ালারাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সেবা কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনীর (এনডিআরএফ) সদস্যরা সার্বক্ষণিক মোতায়েন রয়েছেন এবং তারা দুর্গতদের সহায়তায় নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
প্রকৃতির এমন চরম রোষানল থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ যেমন দিশেহারা, তেমনি প্রশাসনিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া দপ্তরের রেড অ্যালার্ট আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাহাড় ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে। মুম্বাইয়ের মতো একটি ব্যস্ত শহরে যেখানে সময়ের মূল্য অপরিসীম, সেখানে এই ভারী বর্ষণ যেন উন্নয়নের চাকাকে সাময়িকভাবে থমকে দিয়েছে।
এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণ পেতে হলে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সাধারণ মানুষের সতর্কতা এবং সচেতনতা। দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে মানুষ একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে, যা এই কঠিন পরিস্থিতিতে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। এনডিআরএফ কর্মীরা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আটকে পড়া মানুষগুলোকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। মুম্বাই ও পুনের মানুষ এখন অঝোর বর্ষণের সমাপ্তি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রয়াসেই কেবল এই ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্ধারকারী দলগুলো।