প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রমাণিত বা আইনগতভাবে কার্যকর নয় এমন তালাককে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার পারিবারিক বিরোধ বা তালাকসংক্রান্ত জটিলতার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আইনগত অধিকার, যা কোনো অবস্থাতেই খর্ব করা যায় না।
সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ এই রায় দেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর এটি পারিবারিক আইন এবং নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে এক দম্পতির বিয়ে হয়। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হলে স্ত্রী নিজের এবং তাদের নাবালক কন্যাসন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে ফ্যামিলি কোর্টে মামলা করেন। মামলার জবাবে স্বামী দাবি করেন, তিনি ইতোমধ্যে স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে আদালতে তিনি সেই তালাক আইন অনুযায়ী কার্যকরভাবে প্রমাণ করতে পারেননি।
ফ্যামিলি কোর্টে তালাকের বৈধতা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের পক্ষে দেনমোহর এবং ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন। কিন্তু পরে স্বামী নতুন করে একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে দাবি করেন যে, তালাক কার্যকর হয়েছে। সেই মামলাকে ভিত্তি করে তিনি পূর্বে দেওয়া ভরণপোষণ ও দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিত করার আবেদন জানান।
নিম্ন আদালত তার আবেদন খারিজ করে দিলে বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন।
রায়ে আদালত বলেন, কেবল নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে—এই যুক্তিতে আগে দেওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো উপযুক্ত আদালত যদি নির্দিষ্টভাবে সেই ডিক্রি স্থগিত না করেন, তাহলে তা কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট আইন অনুযায়ী সেটি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।
হাইকোর্ট আরও বলেন, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর নয়, তার কোনো আইনগত অস্তিত্ব নেই। ফলে এমন দাবির ভিত্তিতে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান হয়েছে বলে গণ্য করা যাবে না। একই সঙ্গে এমন অপ্রমাণিত তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা সন্তানের ভরণপোষণ এবং দেনমোহর সংক্রান্ত আদালতের রায় কার্যকর করার পথে কোনো আইনি বাধাও সৃষ্টি হয় না।
রায়ে আদালত নাবালক সন্তানের অধিকার প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার পারিবারিক বিরোধ, তালাক বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত নয়। এটি শিশুর একটি স্বাধীন আইনগত অধিকার এবং সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও আদালতের দায়িত্ব।
হাইকোর্ট আরও স্পষ্ট করেন যে, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের। ফলে এসব বিষয়ে অন্য কোনো আদালতে মামলা করে পূর্বে দেওয়া ফ্যামিলি কোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত করা যাবে না।
আইনজীবী ইশরাত হাসান রায়টির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তার মতে, আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী কিংবা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে আদালত শিশুর ভরণপোষণকে একটি স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এই রায় নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে অপ্রমাণিত তালাককে সামনে এনে বিচারপ্রাপ্তি বিলম্বিত করার প্রবণতা কমবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে পারিবারিক বিরোধের মামলায় প্রায়ই তালাকের বৈধতা, ভরণপোষণ ও দেনমোহর নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে নতুন মামলা বা ভিন্ন আইনি কৌশল ব্যবহার করে আদালতের চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। হাইকোর্টের এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের জটিলতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; বরং নারী ও শিশুর সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিশেষ করে নাবালক সন্তানের ভরণপোষণকে স্বাধীন অধিকার হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করায় ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।