প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃষক ও রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের জনপদ কুড়িগ্রাম। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতিবিজড়িত এই উত্তরের জেলাটি বরাবরই প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে নতুন করে বেগবান করার প্রত্যয় নিয়ে সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদরের টগরাই হাট হাইস্কুলে এক বিশাল কৃষক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন অঙ্গ-সংগঠন ‘জাতীয় কৃষক শক্তি’র আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। হাজারো কৃষকের উপস্থিতিতে এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই জমায়েত যেন কেবল একটি সংগঠনের উদ্বোধন ছিল না, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার বিপরীতে কৃষকের নতুন করে জেগে ওঠার এক প্রতীকী বার্তা।
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সংগঠনের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন, যার নেতৃত্বে থাকছেন আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম। এছাড়া কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন আহমেদ জাকি ও আব্দুল আজিজ, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব পদে মজিবুর রহমান খোকন ও রাকিবুল হাসান রানা এবং মুখ্য সংগঠক হিসেবে নফিউল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নবগঠিত এই সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বলতে গিয়ে বক্তারা কৃষকের মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাঁদের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন।
কৃষক শক্তির সদস্য সচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের কৃষিখাতের চরম সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষের অন্ন সংস্থানের মূল কারিগর কৃষক। ঘাম ঝরিয়ে যারা মাঠ ভরা ফসল ফলায়, সেই তারাই আজ উৎপাদন উপকরণের উচ্চমূল্য, সারের সংকট এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার যন্ত্রণায় পিষ্ট। সেলিমের মতে, কৃষকের এই করুণ দশা একদিনে তৈরি হয়নি। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারাই এই সংকটের প্রধান কারণ। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেন যে, জাতীয় কৃষক শক্তি কেবল একটি সাধারণ সংগঠন নয়, বরং এটি কৃষকের অধিকার আদায়ের একটি প্ল্যাটফর্ম। তাঁদের লক্ষ্য হলো এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কৃষক আর করুণার পাত্র হয়ে থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম উত্তরাঞ্চলের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের বিরোধীদলীয় অধিকাংশ সংসদ সদস্যই উত্তরাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন, অথচ পরিকল্পিতভাবে এই জনপদকে বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে রাখা হয়েছে। রংপুর ও কুড়িগ্রামের মতো কৃষিপ্রধান এলাকাগুলো দীর্ঘকাল ধরে অবহেলার শিকার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বড় কোনো অর্জন নিয়ে আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা অধরাই রয়ে গেছে, যা তিস্তাপাড়ের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। উন্নয়নের এই বৈষম্য দূর করে কৃষকের সংকট নিরসনে জাতীয় কৃষক শক্তি তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, আমরা স্বাধীনতার বহু বছর পার করলেও এখনো কৃষকদের নিয়ে একটি সম্মিলিত ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি। আমাদের চাষাবাদ পদ্ধতি এখনো অনেকটা প্রাচীন এবং ব্যয়বহুল। পণ্য বিক্রির সময়েও কৃষকেরা সিন্ডিকেটের কারসাজি ও বৈষম্যের শিকার হন, যার ফলে তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যায়। এই বৃত্ত থেকে কৃষকদের বের করে আনতে আধুনিক প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। তিনি বিশ্বাস করেন, জাতীয় কৃষক শক্তি এই কৃষকদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে এবং তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য মাঠে থেকে লড়াই করবে।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল মিয়া, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল, যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদুজ্জামান তাওহীদসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ কৃষকের সমস্যা ও সংগঠনের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। এছাড়া ন্যাশনাল ওলামা এ্যালায়েন্স, জেলা নারী শক্তি, স্বেচ্ছাসেবক শক্তি, যুব শক্তি ও ছাত্রশক্তির আহ্বায়করাসহ বিভিন্ন স্তরের নেতারা উপস্থিত থেকে সংহতি জানান।
সমাবেশটি ছিল আবেগময়। মওলানা ভাসানীর সেই চিরচেনা স্লোগান যেন আবার কুড়িগ্রামের বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল। প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ে কুড়িগ্রামের মাটি যে বারবার নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে, জাতীয় কৃষক শক্তির এই আত্মপ্রকাশ সেই ঐতিহ্যেরই এক নতুন সংযোজন। আধুনিক যুগে এসে কৃষকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তাদের অন্ন যোগানোর সংগ্রামের পাশে দাঁড়ানোর যে অঙ্গীকার নিয়ে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করেছে, তা কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সবশেষে, উপস্থিত কৃষকদের মুখে যে আশার আলো দেখা গেছে, তা কেবল স্বপ্ন নয়, বরং অধিকার আদায়ের দৃপ্ত সংকল্প। কুড়িগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা যদি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবেই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কৃষকের মুখে সত্যিকারের হাসি ফোটানো সম্ভব হবে।