কাপ্তাই হ্রদে পানির চাপ, খুলছে স্পিলওয়ের ১৬ গেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ বার
কাপ্তাই হ্রদে পানির চাপ, খুলছে স্পিলওয়ের ১৬ গেট

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ জলাধার কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পানি ধারণক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে থাকায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট আংশিক খুলে পানি নিষ্কাশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কর্ণফুলী নদীর ভাটির এলাকায় পানির প্রবাহ বাড়তে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত বাড়ছে। সেই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া ও নদী দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি হ্রদে এসে জমা হচ্ছে। ফলে জলাধারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখতে পর্যায়ক্রমে স্পিলওয়ের গেট খুলে অতিরিক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসানের স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০৩ দশমিক ৯১ ফুট (এমএসএল)। যদিও বাঁধের সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট (এমএসএল), তবুও চলমান বৃষ্টিপাত এবং উজানের প্রবল পানিপ্রবাহ বিবেচনায় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্পিলওয়ের গেট খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল ১১টা থেকে যেকোনো সময় স্পিলওয়ের ১৬টি গেট প্রায় ৬ ইঞ্চি পরিমাণ উত্তোলন করা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে এই প্রক্রিয়ায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসিক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশন করা হবে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ এবং হ্রদের পানির উচ্চতার ওপর নির্ভর করে গেট খোলার সময় এবং পরিমাণ পরিবর্তন করা হতে পারে। যদি পানির প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে ধাপে ধাপে গেট আরও বেশি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। এ কারণে পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে সব সময় ভারসাম্য বজায় রেখে পানি ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে হয়। একদিকে বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে ভাটির এলাকায় আকস্মিক পানি বৃদ্ধি যেন মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য ঝুঁকি তৈরি না করে, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।

স্পিলওয়ের গেট খুলে দেওয়া হলে কর্ণফুলী নদীর ভাটির বিভিন্ন এলাকায় পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা, চরাঞ্চল এবং মাছের ঘের বা কৃষিজমির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন স্থানীয় বাসিন্দা, নৌযান চালক, জেলে এবং নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন পেশার মানুষের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। নদীর পানির স্রোত হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপ্রয়োজনীয় অবস্থান না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। কাপ্তাই বাঁধে সংরক্ষিত পানির মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বর্ষাকালে জলাধারে পর্যাপ্ত পানি জমা হওয়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতিবাচক হলেও অতিরিক্ত পানি বাঁধের নিরাপত্তা এবং আশপাশের এলাকার জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে সময়মতো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ পার্বত্য এলাকায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে কাপ্তাই হ্রদে আরও পানি প্রবেশ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিকভাবে পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিয়মিত সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে শুধুমাত্র সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক ঢল এবং জলাধারে দ্রুত পানি বৃদ্ধির ঘটনা আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় কাপ্তাই বাঁধসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলাধারে আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, পূর্বাভাসভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগণের আগাম প্রস্তুতির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং উজান থেকে পানির প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম পরিকল্পনা এবং সময়োপযোগী পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে বড় ধরনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই কাপ্তাই হ্রদের বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভাটির এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত