প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত নানা ঘটনার নেপথ্যে থাকা একটি পরিবার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ বলয়ের বিরুদ্ধে আবারও সোচ্চার হয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাঁর ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, যারা এক সময় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, যারা হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছিল, তারা আজ বিদেশে অবস্থান করেও দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সোহেল তাজের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে, বিদেশে পাচার করা অর্থের পাহাড় গড়ে বসে তারা কীভাবে দেশের সাধারণ নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার নীলনকশা তৈরি করছে।
সোহেল তাজের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে যে ক্ষোভ ফুটে উঠেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত কোনো অভিমত নয়, বরং এটি জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত অসংখ্য মানুষের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। তিনি তাঁর লেখায় স্মৃতিচারণ করেছেন সেই দুঃসহ সময়ের, যখন দেশে আইনের শাসনের বদলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দলীয়করণ ও নিপীড়নের সংস্কৃতি। তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট পরিবার এবং তাদের অনুগত সাঙ্গপাঙ্গরা বাংলাদেশকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে। তাদের দুঃশাসনের ফলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় যে ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র জাতি দেখেছে, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। শত শত মানুষের প্রাণহানি, অগণিত মানুষের অন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অসংখ্য তরুণের পঙ্গুত্ববরণ করার যে করুণ ইতিহাস, তার দায়ভার ওই অপশক্তির ওপরই বর্তায় বলে তিনি মনে করেন।
সোহেল তাজ অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে দুর্নীতির ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। এই অর্থ কেবল দেশের সম্পদ নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের হকের টাকা। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, একদিকে যখন দেশের সাধারণ মানুষ উন্নয়নের স্বপ্নে বিভোর ছিল, তখন অন্যদিকে একটি চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়ে সেখানে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। তিনি আরও বলেন, এই দুর্নীতির কারণে কেবল দেশের ক্ষতিই হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিজেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আদর্শের রাজনীতিকে বিসর্জন দিয়ে যারা অর্থ উপার্জনকে মূল লক্ষ্য বানিয়েছিল, তারা আজ সংগঠনের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে অভিযোগটি তিনি এনেছেন, তা হলো বিদেশে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নামে অস্থিরতা তৈরির পাঁয়তারা। তিনি অভিযোগ করেন, যারা দেশের অর্থ লুটে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, তারা এখন নিরাপদ দূরত্বে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রপাগান্ডার মাধ্যমে সাধারণ নেতাকর্মীদের উসকে দিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো দেশের ভেতরে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পুরনো নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত করা। এই চক্রটি জানে যে, তারা সরাসরি মাঠে ফিরে আসতে পারবে না, তাই তারা প্রক্সি হিসেবে সাধারণ কর্মীদের আবেগ ও ক্ষোভকে পুঁজি করছে। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে ফায়দা লুটতে তারা যে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা তাদের কর্মকাণ্ড দেখলেই বোঝা যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সোহেল তাজের এই বক্তব্য কেবল অতীতের সমালোচনা নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তিনি মনে করেন, যারা দেশের ক্ষতি করেছে, যারা জনগণের রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের কোনোভাবেই আর রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি ঘেঁষতে দেওয়া উচিত নয়। যারা বিদেশে বসে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি। তিনি মনে করেন, দেশের মানুষ আজ সচেতন, তারা বুঝতে পারছে কারা দেশের মঙ্গল চায় আর কারা কেবল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। বিদেশে বসে যারা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ব্যস্ত, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবেও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
রাজনীতিতে এমন কঠোর অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে সোহেল তাজ একটি নৈতিকতার প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তিনি কি কেবল একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কথা বলছেন, নাকি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সেই সব মানুষের কণ্ঠস্বর হচ্ছেন, যারা একনায়কতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিল? বিশ্লেষকদের মতে, সোহেল তাজের এই সাহসিকতা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ। ক্ষমতার লোভে যারা আদর্শ বিসর্জন দিয়েছে, তাদের এই বয়ান নিঃসন্দেহে অস্বস্তিতে ফেলবে। তবে সোহেল তাজের এই বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশে অবস্থানরত ওই চক্রের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
পরিশেষে বলা যায়, সোহেল তাজের এই ফেসবুক পোস্টটি একটি দীর্ঘ নীরবতা ভাঙার সংকেত। দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে এখন শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছে। যারা অতীতে অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হোক—এটাই এখন জনগণের প্রাণের দাবি। বিদেশে পাচার করা অর্থের পাহাড়ের ওপর বসে থাকা সেই চক্রটি যদি সত্যিই দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়, তবে তাদের সেই পথ রুদ্ধ করতে প্রশাসন ও সচেতন জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সোহেল তাজের এই সাহসী ভাষ্য অন্তত এই বার্তাটিই দেয় যে, অপরাধীরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে লুকিয়ে থাকলেও ইতিহাসের দায় থেকে তারা কখনো মুক্তি পাবে না।