জিয়া হত্যা মামলায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার দণ্ডিত মেজর মোজাফফর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৩ বার
জিয়া হত্যা মামলায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার দণ্ডিত মেজর মোজাফফর

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘটেছিল ইতিহাসের এক নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা ছিল সেই হত্যাকাণ্ডের অনেক কুশীলবের পরিচয় ও অবস্থান। সেই ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী এবং দীর্ঘদিনের পলাতক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁর এই গ্রেপ্তার জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারিক ইতিহাস এবং সেই সময়ের নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য উন্মোচনের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জুলাই বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর থেকেই তিনি ছিলেন পলাতক। দীর্ঘ ৪৫ বছর দেশের ভেতর এবং বাইরে আত্মগোপনে থাকা ৭৭ বছর বয়সী এই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে এখন সোপর্দ করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর কাছে। ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পর থেকেই শুরু হয়েছে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা। পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ঠিক কোন আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর বিচার হবে কিংবা দীর্ঘ এই সময় তিনি কাদের আশ্রয়ে কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো বিবৃতি আসেনি।

ইতিহাসের পাতায় জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় মেজর মোজাফফরের নাম বারবার উঠে এসেছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও দলিল থেকে জানা যায়, সেই কালরাতে সার্কিট হাউসে আক্রমণকারী সেনা কর্মকর্তাদের মূল দলের সঙ্গে ছিলেন মোজাফফর। বিশিষ্ট সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে উঠে এসেছে ঘটনার ভয়ংকর সব বর্ণনা। সেখানে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানকে যখন কক্ষ থেকে বাইরে আনা হয়, তখন তাঁর সবচেয়ে কাছে ছিলেন মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। মাসকারেনহাসের দাবি অনুযায়ী, মোজাফফর তখন কাঁপছিলেন এবং তিনি দাবি করেছিলেন যে তাঁকে বলা হয়েছিল জিয়াকে কেবল সার্কিট হাউস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, হত্যার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তবে এই দাবি আদৌ কতটুকু সত্য, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে প্রশ্ন থেকে গেছে।

হত্যার ঘটনার পর মোজাফফরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয়, যা তাঁর ‘নির্দোষ থাকার’ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মাসকারেনহাসের বয়ান অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ঘণ্টাখানেক পর তিনি পুনরায় সার্কিট হাউসে ফিরে যান এবং জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরি ও গোপন কাগজপত্র খোঁজার কাজে নেতৃত্ব দেন। এমনকি বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর জেনারেল মঞ্জুর ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে পালানোর সময়ও তিনি মূল দলের সঙ্গে ছিলেন। পরে সরকার-অনুগত বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির একপর্যায়ে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। সেই থেকে শুরু হওয়া তাঁর পলাতক জীবন দীর্ঘ ৪৫ বছর স্থায়ী হয়েছে। তাঁকে ধরিয়ে দিতে অতীতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইটিতে মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ আছে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মইনুল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ব্যাংককে দেখা করেছিলেন পলাতক মেজর খালেদ ও মোজাফফর। সেখানে জিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁদের সঙ্গে মইনুলের আলাপ হয়েছিল। সেই আলোচনায় তাঁরা দাবি করেছিলেন যে, জিয়াকে হত্যার ইচ্ছা তাঁদের ছিল না, বরং তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছিল। তবে খালেদ ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে মারা যাওয়ায় এবং মোজাফফর আত্মগোপনে থাকায় সেই বয়ান কোনো আদালতে যাচাই হওয়ার সুযোগ পায়নি।

দীর্ঘ এই সময় মোজাফফর কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে জনমনে কৌতুহল চরমে। জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করতেন। এরপর ব্যাংককসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর যাতায়াতের গুঞ্জন রয়েছে। বনানীর যে বাসা থেকে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেখানে তিনি কতদিন ছিলেন কিংবা তাঁকে কে বা কারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় রহস্য। পুলিশের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ কঠোর নজরদারির মাধ্যমে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, তবে পর্দার পেছনের সহায়তাকারীদের নাম এখনো প্রকাশিত হয়নি।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর মোজাফফরের গ্রেপ্তার কেবল একজন ব্যক্তির আটক হওয়া নয়, এটি সেই সময়ের অনেক অসমাপ্ত ইতিহাসের উত্তর পাওয়ার সুযোগ। সার্কিট হাউসে সেদিন প্রকৃত নির্দেশদাতা কারা ছিল, জিয়ার মরদেহ এবং ব্যক্তিগত নথিপত্র কোথায় নেওয়া হয়েছিল, এবং বিদ্রোহের পরবর্তী উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর মোজাফফরের মুখ থেকেই পাওয়া সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে কী ধরনের তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারে। একই সঙ্গে, ৪৪ বছর পর যে বিচারিক বা সামরিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি তিনি হতে যাচ্ছেন, তা জিয়া হত্যার বিচারিক ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশবাসী এখন অপেক্ষায় আছে সেই সময়ের প্রকৃত সত্য জানার এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা রহস্যের নিস্পত্তির।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত