দেবীগঞ্জে ছড়াচ্ছে পার্থেনিয়াম, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
দেবীগঞ্জে ছড়াচ্ছে পার্থেনিয়াম, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় নীরবে বিস্তার লাভ করছে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিকর আগ্রাসী আগাছা পার্থেনিয়াম। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংলগ্ন এলাকা, সরকারি অফিসপাড়া, খোলা জায়গা এবং জনসমাগমস্থলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই আগাছা স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পার্থেনিয়াম শুধু কৃষি উৎপাদনের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের জন্যও বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয় পর্যায়ে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদসংলগ্ন লিচুতলা এলাকা, পুলিশ সার্কেল অফিসের আশপাশ, সোনাহার-দেবীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে বিপুল পরিমাণ পার্থেনিয়াম জন্ম নিয়েছে। সড়কের দুই পাশে, পরিত্যক্ত জমিতে, ড্রেনের ধারে এবং খোলা স্থানে গাছটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছগুলো ফুলও ধরতে শুরু করেছে, যা থেকে বাতাসের মাধ্যমে বীজ ও পরাগরেণু আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজ, নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, দেবীগঞ্জ মহিলা কলেজ, দেবীগঞ্জ টেকনিক্যাল কলেজ এবং আলাদিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন যেসব সড়ক ব্যবহার করে, সেসব পথের ধারে এই আগাছার ব্যাপক বিস্তার দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষ এসব পথ দিয়ে চলাচল করলেও অধিকাংশই জানেন না যে দেখতে সাধারণ আগাছার মতো মনে হলেও পার্থেনিয়াম মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

২০২১ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Agronomy-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় পার্থেনিয়ামকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর আগ্রাসী আগাছাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই উদ্ভিদ অত্যন্ত দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং মাটি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নেয়। ফলে আশপাশের কৃষিজ ফসল প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পার্থেনিয়ামের শিকড় ও পাতা থেকে ‘পার্থেনিন’ নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা অন্য উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদ্গম ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এর ফলে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। একই সঙ্গে বাতাসে ভেসে বেড়ানো এর পরাগরেণু অন্যান্য ফসলের স্বাভাবিক পরাগায়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মানবস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পার্থেনিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গাছের সংস্পর্শে এলে অনেকের ত্বকে লালচে দাগ, চুলকানি, তীব্র অ্যালার্জি এবং কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস দেখা দিতে পারে। এর পরাগরেণু বাতাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে হাঁপানি, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, সাইনোসাইটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখের পাতা ফুলে ওঠা এবং দীর্ঘ সময় সংস্পর্শে থাকলে ‘হে ফিভার’-এর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি বিভাগের অধ্যাপক ড. পারভেজ আনোয়ার বলেন, পার্থেনিয়াম একটি অত্যন্ত আগ্রাসী বিদেশি উদ্ভিদ, যা নতুন পরিবেশে খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এটি স্থানীয় উদ্ভিদকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয় এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে ফসলের অঙ্কুরোদ্গম ও উৎপাদন কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। মানুষের মধ্যে অ্যালার্জি, চর্মরোগ, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের মতো নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।

দেবীডুবা ইউনিয়নের কৃষক খোরশেদ আলম জানান, তিনি প্রায় দেড় বিঘা জমিতে মরিচের চাষ করেছেন। কিন্তু তার জমিতে পার্থেনিয়ামের ব্যাপক বিস্তার হওয়ায় আগাছা পরিষ্কার করতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দিতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং ফসলের পরিচর্যায়ও অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক কৃষক এখনও এই আগাছার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবগত নন। ফলে সময়মতো আগাছা দমন না করায় এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পার্থেনিয়াম সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাবই এর বিস্তারের অন্যতম কারণ। অধিকাংশ মানুষ গাছটিকে সাধারণ আগাছা মনে করে উপেক্ষা করেন। কিন্তু এটি ফুল ও বীজ ছড়িয়ে আশপাশের এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রতিবছর এর বিস্তৃতি আরও বাড়ছে।

স্থানীয়রা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস এলাকা, বাজার, সড়কের দুই পাশ এবং জনবহুল স্থান থেকে দ্রুত পার্থেনিয়াম অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সচেতনতামূলক প্রচার এবং কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এটি দেবীগঞ্জের কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে বিস্তারিত অবগত ছিলেন না। সংবাদটি জানার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদ বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পার্থেনিয়ামের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে কৃষকদের গাছটি শনাক্ত করতে সহায়তা করছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি আগাছাটি ফুল আসার আগেই অপসারণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, কারণ এ সময়ই দমন কার্যক্রম সবচেয়ে কার্যকর হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পার্থেনিয়ামের মতো আগ্রাসী উদ্ভিদ দমনে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবিদ, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সময়মতো গাছ অপসারণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই আগাছার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যথায় এটি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত