বন্যা পরিস্থিতি: চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৩ বার
বন্যা পরিস্থিতি: চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

প্রকাশ: ১৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রকৃতির রুদ্ররোষ এবং আকস্মিক বন্যার তাণ্ডবে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম জনপদ। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও জনজীবন যখন স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে, ঠিক তখনই শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে এল এক বিশাল দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ভয়াবহ বিপর্যয় বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের অবশিষ্ট সব পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়, যা হাজার হাজার পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করল।

গত কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পক্ষে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানো এখন একটি দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার সময়সূচি অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জানমালের নিরাপত্তা ও তাদের মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে হলো। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ এবং যাতায়াতের তীব্র সংকটের কারণেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

শুধুমাত্র চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা নয়, এর প্রভাব ছড়িয়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (বিএমটি), এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষার ওপরও। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন এই সকল বোর্ডের অবশিষ্ট সব বিষয়ের পরীক্ষা এখন থেকে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এই ঘোষণার ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক প্রকার স্থবিরতা নেমে এসেছে। অভিভাবকরা বলছেন, পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও সহায়-সম্পদ হারিয়ে এখন দিশেহারা, তার ওপর পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং কেন্দ্রে যাওয়া—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

বোর্ড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পরীক্ষার পরিবর্তিত ও সংশোধিত সময়সূচি পরবর্তীতে পৃথক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন জেলার বাইরে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত রুটিন অনুযায়ী যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ, এবারের পরীক্ষার এই স্থগিতাদেশটি কেবল বন্যাকবলিত চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্যই প্রযোজ্য। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং বন্যা দুর্গতদের মানবিক বিপর্যয়ের দিকটিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ কয়েক বছর প্রস্তুতির পর এইচএসসি পরীক্ষা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, আর সেই ধাপের মাঝপথে এমন অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারে। তবে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম বোর্ডে এমন অনেক কেন্দ্র রয়েছে যেখানে এখনো হাঁটু সমান পানি জমে আছে। অনেক পরীক্ষার্থীর পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এমন অবস্থায় পরীক্ষা গ্রহণ করা কেবল যান্ত্রিকভাবে সম্ভব হলেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা ন্যায়সংগত হতো না। তাই বোর্ড কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবক মহল।

প্রকৃতির এই নির্মম খেলার সামনে মানুষ আজ অসহায়। বন্যায় তলিয়ে যাওয়া বইপত্র, হারিয়ে যাওয়া পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং আগামীর অনিশ্চয়তা নিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। তবে আশার কথা এই যে, সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতিটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উপযোগী হবে, তখনই নতুন রুটিন ঘোষণা করা হবে। শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন হলে তাও বিবেচনা করা হবে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই দুর্যোগময় সময়টি পার করা সম্ভব। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এই কঠিন মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর যে নজির স্থাপন করল, তা প্রশংসার দাবি রাখে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মনোবল অটুট রাখার জন্য প্রয়োজন পরিবারের সান্ত্বনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকনির্দেশনা। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে হয়তো একসময় শান্ত হবে, জল নেমে যাবে চট্টগ্রামের মাঠঘাট থেকে, কিন্তু এই সময়ে শিক্ষার্থীদের যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সামগ্রিক সহযোগিতা। শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর নতুন রুটিন ঘোষণার সময় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় যেন বরাদ্দ রাখা হয়, যাতে তারা কোনো ধরনের বাড়তি চাপ অনুভব না করে। চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা আজ এই দুর্যোগ জয় করে আবারও তাদের শিক্ষাজীবনে ফিরে আসবে—এই প্রত্যাশাই এখন সকলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত