বড় জা হত্যা: ছোট জায়ের স্বীকারোক্তি ও ডাকাতির নাটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ বার
বড় জা হত্যা: ছোট জায়ের স্বীকারোক্তি ও ডাকাতির নাটক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পারিবারিক কলহের জেরে এক করুণ ও অমানবিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হলো চাঁদপুরের শাহরাস্তি। আপন জায়ের হাতে খুন হলেন অন্য জা। এই হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধ ঢাকার জন্য সাজানো হয়েছিল ডাকাতির এক সাজানো নাটক, যা দ্রুতই পুলিশের পেশাদার তদন্তের মুখে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শাহরাস্তি পৌরসভার বাত্তলা ব্যাপারী বাড়ির রিগান আক্তার (২৬) নামের এক গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘটা এই ঘটনায় ছোট জা সুমাইয়া আক্তারের (২৪) আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পুরো এলাকাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। একটি সাধারণ পারিবারিক মনোমালিন্য যে কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে, এই ঘটনা তার এক জীবন্ত ও নৃশংস উদাহরণ হয়ে থাকল। মানুষ যখন তুচ্ছ অহংবোধ ও ক্ষোভকে প্রশ্রয় দেয়, তখন পারিবারিক পবিত্রতা ও সম্পর্কের বাঁধন যে মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে, তার এক মর্মান্তিক দলিল এই ঘটনা।

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে। বাত্তলা ব্যাপারী বাড়ির সাইফুল ইসলামের স্ত্রী রিগান আক্তার এবং তাঁর ছোট জা সুমাইয়া আক্তারের মধ্যে পারিবারিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের সুপ্ত বিবাদ ছিল। যৌথ পরিবারে বসবাস করতে গিয়ে যে ধরনের ছোটখাটো মনোমালিন্য বা রেষারেষি তৈরি হয়, তা ধীরে ধীরে দানা বেঁধেছিল তাদের মধ্যে। তুচ্ছ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেদিন রাতে তাঁদের মধ্যে তীব্র তর্কাতর্কি ও বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে সেই বিবাদ ব্যক্তিগত ক্রোধে রূপ নেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জবানবন্দিতে সুমাইয়া আক্তার জানান, ঝগড়ার এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। সেই মুহূর্তের তীব্র আক্রোশ আর রাগের বশবর্তী হয়ে সুমাইয়া তাঁর বড় জা রিগান আক্তারের গলায় নিজের ওড়না পেঁচিয়ে ধরেন। শ্বাসরোধের অসহ্য যন্ত্রণায় রিগান আক্তার নিস্তেজ হয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের চোখের সামনেই বড় জাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে সুমাইয়া সেদিন ঠিক কতটা বিচলিত বা আতঙ্কিত ছিলেন, তা কেবল তাঁর মনের গহীনেই চাপা পড়ে আছে।

নিজের অপরাধের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে সুমাইয়া আক্তার দ্রুত নিজেকে সামলে নেন এবং হত্যার ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য এক ধূর্ত পরিকল্পনা আঁটেন। তিনি পুরো ঘটনাটিকে ‘ডাকাতির ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি করে পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। ডাকাতির নাটক সাজিয়ে তিনি প্রচার করেন যে, কোনো অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী গভীর রাতে ঘরে ঢুকে রিগান আক্তারকে হত্যা করেছে। এই সাজানো গল্পে পরিবারের লোকজনসহ এলাকাবাসীও প্রথম দিকে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। পরদিন সকালে মরদেহ উদ্ধারের পর রিগান আক্তারের বাবা কবির হোসেন থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরিবারের কারোই তখন ধারণা ছিল না যে, ঘাতক ঘরের ভেতরেই অপেক্ষায় আছে।

বুধবার সকালে যখন পুলিশের কাছে খবর পৌঁছায়, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল ঘটনার আলামত সংগ্রহ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের চুরির আলামত বা জোরপূর্বক প্রবেশের প্রমাণ না পাওয়ায় পুলিশের তদন্তকারীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। যে ঘরের ভেতর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেখানে বাইরের কারো উপস্থিতির কোনো চিহ্নই ছিল না। দরজা বা জানালা ভাঙার কোনো লক্ষণ ছিল না, এমনকি রিগান আক্তারের ব্যক্তিগত মূল্যবান কোনো কিছুও খোয়া যায়নি। পুলিশের চৌকস দল খুব দ্রুতই বুঝতে পারে যে, এটি কোনো পেশাদার ডাকাতের কাজ নয়, বরং ঘরের ভেতরের পরিচিত কারও জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সন্দেহের তালিকায় সবার ওপরে উঠে আসেন ছোট জা সুমাইয়া আক্তার।

পুলিশি জেরার মুখোমুখি হয়ে সুমাইয়া আক্তার প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি একাই রিগান আক্তারকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন। কোনো ডাকাত বা বহিরাগত নয়, বরং ঘরের ভেতরেই ঘটেছিল এই নির্মম হত্যাকাণ্ড। পুলিশ সুপারের মতে, নিজেদের মধ্যে তুচ্ছ কোনো কারণে সৃষ্ট হিংসা ও বিবাদের জেরেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এমন সামান্য কারণে যে মানুষের প্রাণ চলে যেতে পারে, তা পরিবারের অন্য সদস্যরা এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। পরিবারের মানুষের জন্য এটি এক বিশাল ট্র্যাজেডি, যেখানে একটি ঘরের ভেতরেই ঘটে গেল এমন এক নৃশংস কাণ্ড। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের আপন দুই সদস্যকে আলাদা করেনি, বরং তাদের পুরো পরিবারের শান্তি ও বিশ্বাসের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সুমাইয়া তাঁর অপরাধের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জানান যে, রাগের মাথায় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং হাতাহাতির সময় বড় জা রিগান আক্তারকে ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করার পর তিনি ভয়ে ডাকাতির নাটক সাজিয়েছিলেন। তাঁর এই স্বীকারোক্তি আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং সকল আলামত যাচাই করে সুমাইয়াকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই স্বীকারোক্তি মামলার গতিপথকে আরও স্পষ্ট করেছে এবং পুলিশের তদন্তকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।

এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের পারিবারিক সম্পর্কের ভঙ্গুরতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। যৌথ পরিবারে ছোটখাটো মনোমালিন্য বা ঝগড়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে তা যখন চরম আকার ধারণ করে প্রাণের বিনিময়ে নিষ্পত্তি হয়, তখন তা সমগ্র সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সহমর্মিতা ও ধৈর্যের অভাব এবং মুহূর্তের আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাশুল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, রিগান আক্তারের অকাল মৃত্যু সেই বার্তাই দিচ্ছে। শাহরাস্তির বাত্তলা ব্যাপারী বাড়ির এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা এখনো কল্পনা করতে পারছেন না যে, পাশাপাশি ঘরে থাকা দুজন জায়ের সম্পর্ক কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে হত্যাকারী ও নিহতের সম্পর্কে রূপান্তরিত হলো। মানুষের মনের ভেতরের অশুভ প্রবৃত্তি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা এই ঘটনায় সুস্পষ্ট।

পুলিশের কার্যকর ভূমিকা এবং দ্রুত তদন্তের ফলে এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। অপরাধ করে পার পাওয়া যে সম্ভব নয়, এই ঘটনা আবারও তা প্রমাণ করল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চাঁদপুরের পুলিশ প্রশাসনের এই সাফল্য প্রশংসনীয়। বর্তমানে আসামি সুমাইয়া আক্তার বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছেন। শাহরাস্তির এই ঘটনাটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি পারিবারিক অশান্তি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক চরম বহিঃপ্রকাশ, যা থেকে উত্তরণের জন্য পারিবারিক সচেতনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা অত্যন্ত জরুরি। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং অপরাধী তার কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি পাবে, এটাই এখন কাম্য। তবে একটি পরিবারের ধ্বংসের এই করুণ চিত্র যেন আর কোথাও না ঘটে, সেজন্য সচেতনতা বৃদ্ধিই এখন সময়ের দাবি। এই ঘটনার মাধ্যমে একটি পরিবারের প্রতিটি সদস্য আজ যে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যে সারাজীবনের আক্ষেপ আর অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সুমাইয়ার এই স্বীকারোক্তি তারই এক নিষ্ঠুর বাস্তব প্রতিফলন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত