বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে তুলে ধরবে ইউএনএফপিএ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৬ বার
বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে তুলে ধরবে ইউএনএফপিএ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও দৃশ্যমান করে তুলতে এবং দেশকে একটি সফল উন্নয়ন মডেল হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)। বিশেষ করে জনমিতিক সহনশীলতা, নারীর ক্ষমতায়ন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অর্জনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে সংস্থাটি ভবিষ্যতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে।

এছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্য, যুব উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য জনসংখ্যা তথ্যব্যবস্থা, সুস্থ বার্ধক্য এবং উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদারের আশ্বাস দিয়েছে ইউএনএফপিএ।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) নিউইয়র্কে ইউএনএফপিএর সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। প্রতিনিধিদলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. মনজুর হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। ইউএনএফপিএর পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডিয়েনে কেইতা।

বৈঠকে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জীবনচক্রভিত্তিক সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দ্রুত পরিবর্তিত জনসংখ্যাগত বাস্তবতায় বাংলাদেশ সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য জনমিতিক তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নের জন্য শক্তিশালী পরিসংখ্যান ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। ড. তিতুমীর বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি ইউএনএফপিএর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের পর তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সম্ভাবনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, দেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে জনসংখ্যার বয়স কাঠামোতে পরিবর্তনের ফলে যে দীর্ঘায়ুজনিত সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, সেটিকেও উন্নয়নের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে মা, শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শক্তিশালী জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং নীতিনির্ধারণে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউএনএফপিএর পরবর্তী কান্ট্রি প্রোগ্রামকে বাংলাদেশের পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

জোনায়েদ সাকি বলেন, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মাতৃমৃত্যু হ্রাস, শিশুমৃত্যু কমানো, নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে সফল উন্নয়ন অনুশীলনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।

ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক ডিয়েনে কেইতা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, জনমিতিক সহনশীলতা, প্রজনন স্বাস্থ্য, যুব উন্নয়ন, সুস্থ বার্ধক্য, নির্ভরযোগ্য জনসংখ্যা তথ্যব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনী অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব খাতে ভবিষ্যতেও ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের পাশে থাকবে এবং সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। দেশটি প্রমাণ করেছে যে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর নীতি এবং জাতীয় মালিকানাবোধ থাকলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গতি অনেক বেশি বাড়ানো সম্ভব। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যেভাবে সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হতে পারে।

ডিয়েনে কেইতা আরও বলেন, আগামী দিনগুলোতে ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করবে। শুধু কারিগরি সহায়তাই নয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের উন্নয়ন সাফল্য, জনমিতিক সম্ভাবনা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মডেলকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে সংস্থাটি কাজ করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ইউএনএফপিএর ইতিবাচক অবস্থান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে জনসংখ্যাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং টেকসই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক এই বৈঠক বাংলাদেশ ও ইউএনএফপিএর দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। উন্নয়ন, মানবিক দায়িত্ব, জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব—এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সফল উন্নয়ন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাও আরও জোরালো হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত