পুরোনো নিয়মেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, অপেক্ষায় তফসিল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
পুরোনো নিয়মেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, অপেক্ষায় তফসিল

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুমোদিত হলেও সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী। ফলে গোপন ব্যালটের পরিবর্তে আগের নিয়মেই ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে এবং খুব শিগগিরই তফসিল ঘোষণার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। সেই হিসাবে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন শেষ করতে হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক নির্বাচন কমিশনের নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হবে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী। এই আইনের বিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট ব্যবহারের সুযোগ নেই। যদি একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ব্যালটে স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন। আর যদি একজন বৈধ প্রার্থীই মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। অতীতেও একই নিয়মে একাধিক রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

যদিও সম্প্রতি গণভোটে অনুমোদিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে, কিন্তু সেসব প্রস্তাব কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদের দুই কক্ষের মোট ৪৫০ সদস্যের গোপন ভোটে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা বাড়িয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সংবিধান সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।

সরকারি দল ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। তবে বিরোধী দলগুলো এই কমিটিতে অংশ নেয়নি। তাদের অবস্থান হলো, কেবল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নয়, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার হওয়া উচিত। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই এই সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বর্তমান সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে খুব বেশি অনিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক প্রার্থী না থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজনও হবে না। অতীতেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের একাধিক নজির রয়েছে। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর তৎকালীন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার প্রায় আড়াই মাস ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তৎকালীন স্পিকার মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির যে প্রস্তাব রয়েছে, তার মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। তবে এসব প্রস্তাবের কিছু অংশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়োগক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের সময় এই বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির প্রায় সব সাংবিধানিক দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করতে হয়। এছাড়া ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন ব্যক্তিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে রাষ্ট্রপতি বাধ্য। ফলে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা সীমিত। এ অবস্থায় জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রয়োজন হবে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি প্রকাশ করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সাংবিধানিক সংস্কারের পথচলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। কারণ নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরই জুলাই জাতীয় সনদের বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা আরও গতি পেতে পারে। ফলে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত