কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই পদত্যাগ ১৬ নেতার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই পদত্যাগ ১৬ নেতার

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়ন যুবদলের সদ্য ঘোষিত ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ এবং নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কমিটি অনুমোদনের মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোতেই দলীয় কোন্দল, গুরুতর জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে একযোগে পদত্যাগ করেছেন কমিটির ১৬ জন শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী নেতা। গত সোমবার রাতে উপজেলা যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দপ্তরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এই পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো জেলার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, পুলিশি নির্যাতন এবং অসংখ্যা হামলা-মামলার শিকার ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে প্রবাসী ও অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার অভিযোগ এনে এই গণপদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ঘটনার মূল সূত্রপাত হয় গত রবিবার রাতে, যখন দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং তৃণমূল সংগঠনকে আরও বেশি গতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে আবদুর রশিদকে আহ্বায়ক এবং মাসুদুর রহমানকে সদস্যসচিব করে কুশাখালী ইউনিয়ন যুবদলের ৩১ সদস্যের একটি নতুন আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয় চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা কমিটি। শুধু তাই নয়, নবগঠিত এই কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু তো দূরের কথা, প্রাথমিক কমিটি ঘোষণার কালি শুকাতে না শুকাতেই এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন পদবঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতারা। পদত্যাগকারী ১৬ নেতার মধ্যে ৬ জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ১০ জন সদস্য পদধারী রয়েছেন, যাঁদের স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সক্রিয় উপস্থিতি এবং সুনির্দিষ্ট অবদান রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

পদত্যাগের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে পদত্যাগকারী যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানান যে, নতুন কমিটির শীর্ষ দুই পদ—আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব—দুজনেই বিগত দিনে দীর্ঘ সময় ধরে সুদূর প্রবাসে অবস্থান করছিলেন। দেশের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন তৃণমূলের সাধারণ নেতাকর্মীরা পুলিশি দমনপীড়ন, হামলা এবং গায়েবি মামলার শিকার হয়ে জেল-জুলুম ও নানা নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, তখন এই প্রবাসী নেতারা রাজপথে বা সংগঠনের কার্যক্রমে ছিলেন না। অথচ বিগত দিনের সেই দুঃসময়ের কঠিন দিনগুলোতে লড়াই করা ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের সম্পূর্ণ অবমূল্যায়ন করে হুট করে তাঁদের শীর্ষ পদ উপহার দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং চরম জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদেই তাঁরা স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে স্পষ্ট জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সোমবার রাতে তাঁরা প্রাথমিকভাবে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেও মঙ্গলবার সরাসরি জেলা যুবদলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতৃবৃন্দের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।

একই সুরে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পদত্যাগকারী আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমও। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে গত সতেরো বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের কঠিন আন্দোলনে যাঁরা রাজপথে ছিলেন এবং হামলা-মামলার বিভীষিকা সহ্য করেছেন, তাঁদের প্রতিনিয়ত অবহেলা করা হচ্ছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের রক্তের সঠিক মূল্যায়ন না করে পকেট কমিটি গঠনের মাধ্যমে দলের আদর্শকে ম্লান করার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিগত দিনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখসারিতে সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও নতুন কমিটিতে কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনে চরম ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ হলো এই নাটকীয় গণপদত্যাগ।

এদিকে গণপদত্যাগের এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক এনায়েত উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তিনি ১৬ নেতার একটি পদত্যাগের তালিকা বা পত্র হাতে পেয়েছেন। তবে তিনি পুরো বিষয়টিকে দলীয় কোন্দল বা অন্তর্কোন্দল হিসেবে না দেখে একটি বিশাল রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাভাবিক সাংগঠনিক মতপার্থক্য হিসেবে দেখতে চান। তাঁর ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল একটি বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক সংগঠন। এখানে অসংখ্য যোগ্য, পরীক্ষিত ও পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মী রয়েছে। এত বিশাল পরিসরে সবাইকে একসঙ্গে কাঙ্ক্ষিত পদ বা মূল্যায়ন করা বাস্তবসম্মতভাবে সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। নতুন কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, এটি সত্য যে তাঁরা কিছুদিন বিদেশে ছিলেন, তবে তাঁরা বিদেশে যাওয়ার কাঙ্ক্ষিত সময়কালেও যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদেই আসীন ছিলেন এবং অনেক আগেই তাঁরা সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে দেশে ফিরেছেন। তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব শীঘ্রই স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যস্থতায় এই ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে এবং সবাই মিলে একসঙ্গে দলীয় কাজ চালিয়ে যাবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে এই ধরনের কমিটি গঠন ও পদত্যাগের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে কেন্দ্র বা উপজেলা পর্যায়ে কমিটি ঘোষণার পরপরই ১৬ জনের মতো নেতার একযোগে পদত্যাগের ঘটনা দলীয় শৃঙ্খলা, সংহতি এবং সাংগঠনিক শক্তির জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা। কুশাখালী ইউনিয়ন যুবদলের এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও অসন্তোষ যদি সময়মতো ও দক্ষতার সঙ্গে মীমাংসা করা না হয়, তবে তা শুধু চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নয়, বরং পুরো লক্ষ্মীপুর জেলা যুবদলের সামগ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সামনে যখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং দলকে পুনর্গঠনের নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তখন তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের মন জয় করা এবং তাঁদের ক্ষোভ প্রশমিত করা স্থানীয় নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, জেলা ও উপজেলা যুবদলের শীর্ষ নেতৃত্ব কীভাবে এই জটিল সংকটের সুরাহা করেন এবং পদত্যাগী ক্ষুব্ধ নেতাদের দলে ফিরিয়ে এনে কাঙ্ক্ষিত সাংগঠনিক ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত