প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ বহু বছর ধরে আহমাদিনেজাদকে সম্ভাব্য ‘অ্যাসেট’ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী ইরানের সম্ভাব্য নেতৃত্বে তাঁকে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও ছিল। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকেই গোয়েন্দা বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গোয়েন্দা অভিযান নিয়ে প্রকাশিত অনেক প্রতিবেদনের মতো এখানেও বেশ কিছু নাটকীয় উপাদান রয়েছে। বুদাপেস্টে গোপন বৈঠক, মোসাদের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ, ইরানের ভেতরে গোপন আশ্রয়কেন্দ্র এবং নাটকীয় উদ্ধার অভিযানের মতো ঘটনাগুলো গল্পটিকে আকর্ষণীয় করে তুললেও এগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।
প্রতিবেদনটি মূলত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন ও ইরানি সূত্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে কোনো সরকারি নথি, গোয়েন্দা নথিপত্র, আদালতের রেকর্ড কিংবা পরিচিত কর্মকর্তার প্রকাশ্য সাক্ষ্য এতে যুক্ত করা হয়নি। অপরদিকে মোসাদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং আহমাদিনেজাদের কার্যালয় পুরো দাবিকে ‘হলিউডধর্মী কল্পকাহিনি’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গোয়েন্দা কার্যক্রম বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সংবেদনশীল অপারেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের উৎস এবং তার স্বাধীন যাচাই। বিশেষ করে যখন দাবি করা হয় যে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সাবেক একজন প্রেসিডেন্টকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করছিল, তখন সেই দাবির পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ প্রত্যাশিত। বর্তমান ক্ষেত্রে সেই ধরনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
গল্পটির আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো, এতে বলা হয়েছে মোসাদের তৎকালীন প্রধান ব্যক্তিগতভাবে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রচলিত কার্যপদ্ধতিতে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। সাধারণত কোনো সংস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা সম্ভাব্য একটি অনিশ্চিত বা ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগে সরাসরি অংশ নেন না। এ ধরনের দায়িত্ব সাধারণত মধ্যবর্তী কর্মকর্তা বা বিশেষ অপারেশন টিমের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।
ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা অভিযানের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রচলিত নীতির সঙ্গে প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে গোয়েন্দা মহলেও বিষয়টি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি বড় প্রশ্ন কৌশলগত। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এবং ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয়ের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে যদি কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রভাবিত করতে চাইত, তাহলে তাদের লক্ষ্যবস্তু ভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।
একইভাবে আহমাদিনেজাদকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাঁর প্রেসিডেন্ট থাকাকালে হলোকাস্ট-সম্পর্কিত বিতর্কিত মন্তব্য, ইসরায়েলবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য তাঁকে পশ্চিমা বিশ্বে অত্যন্ত বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তিনি সময়ের সঙ্গে প্রভাব হারান এবং পরবর্তী সময়ে একাধিকবার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতিও পাননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একজন রাজনীতিককে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা করা হলে তা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় বাধার মুখে পড়ত। কারণ কোনো সরকার পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক সমর্থন, অভ্যন্তরীণ বৈধতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবেদনে হাঙ্গেরির মাধ্যমে কথিত যোগাযোগ স্থাপনের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেটিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রমে যত কম পক্ষ জড়িত থাকে, ততই গোপনীয়তা রক্ষা সহজ হয়। ফলে একটি তৃতীয় দেশের সরকারি কর্মকর্তাকে এমন সংবেদনশীল পরিকল্পনায় যুক্ত করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ পেয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরেও এমন কোনো পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় ছিল। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের পর ইরানে কে ক্ষমতায় আসবে, তা আগে থেকেই নিশ্চিতভাবে অনুমান করা সম্ভব নয় বলে তারা সতর্ক করেছিল।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানের ক্ষমতার কাঠামো অত্যন্ত জটিল। সর্বোচ্চ নেতা, আইআরজিসি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভারসাম্যের ওপর দেশটির সিদ্ধান্ত অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই কেবল একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয়।
গোয়েন্দা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো প্রথমে অস্বীকার করা হলেও পরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আবার এমন অনেক আলোচিত প্রতিবেদনও রয়েছে, যেগুলোর দাবির পক্ষে শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে শুধুমাত্র অস্বীকার বা বেনামি সূত্র—কোনোটিই এককভাবে কোনো দাবিকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সংবেদনশীল প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারি নথি, আদালতের দলিল, গোয়েন্দা নথি বা একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে দাবিগুলো সমর্থিত না হচ্ছে, ততক্ষণ সেগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বর্তমানে আহমাদিনেজাদ–মোসাদ সংক্রান্ত দাবিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করলেও এর সত্যতা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। নতুন কোনো প্রমাণ, সরকারি তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে। ততদিন পর্যন্ত এটিকে একটি আলোচিত কিন্তু বিতর্কিত দাবি হিসেবেই দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ।